দাউদকান্দির ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেই ময়লার ভাগাড় তৈরি হয়েছে। পৌরসভা, বাজার এবং বিভিন্ন বাসাবাড়ির সব ময়লা-আবর্জনা এনে ফেলা হচ্ছে মহাসড়কের পাশেই। দুর্গন্ধে যানবাহনের চালক, যাত্রীসহ পথচারীরা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে। উপজেলার দাউদকান্দি বিশ্বরোড পার হলেই চট্টগ্রামমুখী সড়কের পাশে তিন স্থানে দেখা মেলে এ ময়লার এই ভাগাড়। এছাড়া গৌরীপুর-হোমনা আঞ্চলিক সড়কের আঙ্গাউড়া-স্বল্পপেন্নাই সংযোগ সড়কের মুখে এবং গৌরীপুর হাইস্কুল সংলগ্ন খালের মুখে ফেলা হচ্ছে বাজার ও বাসাবাড়ীর ময়লা আবর্জনা।
সরেজমিনে দেখা যায়, দাউদকান্দি বিশ্বরোড পার হলেই পরিবহনের যাত্রীরা নাকমুখ চেপে রাখেন। ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে যেতেই দুর্গন্ধে বাস ভরে উঠে। ময়লার স্তূপ পেরিয়ে গেলেও দুর্গন্ধ আটকে থাকে বাসের মধ্যে। দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গন্ধের এই দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যাত্রীরা ও বাসের চালকসহ স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দাউদকান্দি পৌরসভার আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পাশেই। অনেক দিন ধরে ময়লা ফেলার ফলে সড়কের কয়েকটি স্থান এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
দাউদকান্দি পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ড এবং দাউদকান্দি বাজার থেকে বিপুল পরিমান বর্জ্য বের হয়। এই বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব কোনো জমি না থাকায় ভাগাড় বা ডাম্পিং স্টেশন করা সম্ভব হয়নি। তাই কয়েক বছর ধরে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের তালতলী এক্সপিড সিএনজি পাম্প এলাকায় দীর্ঘদিন ময়লা ফেলা হচ্ছে। চারলেনের মহাসড়কের বেশ কিছু জায়গা ময়লার ভাগাড়ের দখলে। সাধারণ মানুষকে নাকে-মুখে হাত চেপে, নিশ্বাস বন্ধ করে চলাচল করতে হচ্ছে। দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের বসতবাড়িতে। শুধু দাউদকান্দি পৌরসভার ময়লাই নয় গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড বাজারের ময়লাও ফেলা হয় এই মহাসড়কে।
দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক হিসেবেই পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এই মহাসড়কের দাউদকান্দির ১৫ কিলোমিটার অংশে কমপক্ষে তিনটি স্থানে ফেলা হচ্ছে এই ময়লা আবর্জনা। অপরদিকে গৌরীপুর-হোমনা আঞ্চলিক সড়কের আঙ্গাউড়া স্বল্পপেন্নাই সংযোগ সড়কের মুখে এবং গৌরীপুর হাইস্কুল সংলগ্ন খালের মুখে ফেলা হচ্ছে বাজারের ময়লা আবর্জনা। এতে খালের মুখ বন্ধ হয়ে উপজেলার দক্ষিনাঞ্চলের কয়েক হাজার হেক্টর কৃষি জমি অনাবাদি। উপজেলার ব্যস্ততম গৌরীপুর বাজারে প্রতিদিন অর্ধলাখ লোকের যাতায়েত করে।
স্থানীয়রা বলেন, দুর্গন্ধের কারণে এখানে থাকাই দায়। নাক মুখ চেপে চলাচল করতে হয়। দুর্গন্ধ হওয়ায় অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ময়লার ভাগাড়টি এখান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার।
দরজাখোলা মাইক্রোবাসে চলাচলকারী যাত্রীরা বলেন, ময়লার অংশটুকু পার হতে গেলেই দুর্গন্ধ গাড়ির মধ্যে ঢুকে। ময়লার স্থান পার হলেও দুর্গন্ধ যেতে সময় লাগে। অনেক সময় বাচ্চারা বমি করে ফেলে।
সড়কের পাশের এক্সপিড সিএনজি পাম্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সাত্তার বলেন, অপরিকল্পিতভাবে পুরো পৌরসভার ময়লা সড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসে। তারা ময়লার দুর্গন্ধে বসতে পারেনা। ওখান থেকে মশা মাছি কীট প্রতঙ্গ উৎপন্ন হয়। এভাবে তো যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ দুষিত করা সমীচীন মনে করি না। পরিকল্পনা মাফিক ময়লার বাগাড় বা শোধনাগার করা প্রয়োজন।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিবেশবিদ অধ্যাপক মতিন সৈকত বলেন, বাচাঁর জন্য পরিবেশ অপরিহার্য, পরিবেশ যদি ভালো থাকে তাহলে আমরা ভালো থাকবো। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটলে আমাদের বিপর্যয় ঘটবে। পরিবেশ সুরক্ষায় সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিকভাবে আন্দোলন করতে হবে। বিগত সময় দেখেছি এই ময়লার ভাগাড় নিয়ে সংশ্লিষ কর্তৃপক্ষ উদাসীন ছিল। যাদের এ কাজটি দেখাশোনার করার কথা পরিবেশ ভালো রাখতে তাদের কোনো গুরুত্বই ছিলনা। এখন তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্র-জনতা এগিয়ে আসলে বা পরিবেশ সুন্দর রাখতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তৌহিদ আল হাসান বলেন, খোলাস্থান এবং জনবহুল স্থানে ময়লা ফেলায় জীবাণু ছড়াচ্ছে এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে মানুষজন। যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ কর্তৃপক্ষের পরিস্কারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ময়লা থেকে বাতাসের মাধ্যমে বা অনেক সময় বৃষ্টি ও পানিতে নদী খাল ডোবা বা জলাশয়ে ময়লার বিষাক্ত জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। পরবর্তীতে ওই পানি মানুষের শরীরে লাগে বা প্রবেশ করে তখন ত্বকে চুলকানি, দাদসহ বিভিন্ন চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। খোলাস্থানে বর্জ্য ফেলার ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য ঝুঁকির প্রভাব পড়ছে। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এর ফলে ওই এলাকায় মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ছে। এসবের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
দাউদকান্দি পৌর প্রশাসকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জিয়াউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পৌরসভার নিজস্ব কোনো ডাম্পিং বা ময়লা ফেলার নির্ধারিত স্থান না থাকায় এখন পর্যন্ত সড়কের পাশে ময়লা ফেলছে। তবে এভবে চলতে পারে না, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপুর্ণ। আমরা পৌরসভার ভিতরে নিচু কোন খাস জায়গা বা সরকারী জায়গা খুজতেছি।
কুমিল্লা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজীব বলেন, যেহেতেু মহাসড়কটি পৌরসভা এলাকায়, আবার ময়লা ফেলছে পৌরসভা। এর দায়-দায়িত্ব পৌরসভার। বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। আমরা পৌরসভাকে নোটিশ করবো এবং বিষয়টি দেখব।