গুলিটি এক-আধ ইঞ্চি পাশে লাগলে বাঁচানো যেত না রাহাতকে

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৫৬ পিএম

আপনার ওপর আল্লাহর রহমত আছে। আপনাকে বিদ্ধ করা গুলিটি এক-আধ ইঞ্চি পাশে বা নিচে লাগলে ঘটনাস্থলেই আপনার মৃত্যু হতো। কোনোভাবে মেডিকেল আনা গেলেও আমাদের পক্ষে আপনাকে বাঁচানো কঠিন হতো— বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ রাহাতকে এ কথাগুলো বলেছিলেন তাঁর চিকিৎসকরা। গত ৫ আগস্ট সকালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় হামলাকারীদের ছোড়া গুলি গলায় বিদ্ধ হয় রাহাতের। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২১-২২ সেশনের মেধাবী ছাত্র জুনায়েদ খান রাহাত। তিনি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের মৃত নুরুল হক ও জান্নাত আরার ছেলে। ৪ বোনের একমাত্র ভাই রাহাত কোটা আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রতিটি কর্মসূচিতে অগ্রভাগে ছিলেন। সরকার পতনের দিন গত ৫ আগস্ট সকালেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে নগরীর নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থান করেছিলেন তিনি। এ সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা চারিদিক থেকে অতর্কিতে হামলা চালায়। তাদের ছোঁড়া একটি বুলেট রাহাতের গলায় লাগে। সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই মাটিতে পড়ে যান তিনি। রক্তে লাল হয়ে যায় তার পুরো শরীর।

সেদিনের স্মৃতি মনে করতে গিয়ে রাহাত বলেন, ওইদিন কয়েকজন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত শিক্ষার্থীদের ওপর শটগান, পিস্তল, রিভলভার, শুটারগান দিয়ে গুলি চালায়। নগরীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে শুরু করে তিনপুলের মাথা পর্যন্ত ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে তারা। সংঘর্ষে তিনিসহ অনেক ছাত্র আহত হন।

রাহাত বলেন, এক পর্যায়ে গলায় গুলি লাগার পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সহপাঠীরা তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যান। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে পরে ভর্তি হাসপাতালে ভর্তি করান। তার অনেক রক্তপাত হয়েছিল। চারদিন সেখানে থাকার পর কিছুটা শঙ্কামুক্ত হলে চিকিৎসকদের অনুরোধ করে তিনি বাসায় ফিরে আসেন।

তিনি জানান, ‘মেডিকেলে চিকিৎসাধীন থাকাকালে চিকিৎসকরা বলেছেন— আপনার ওপর আল্লাহর রহমত আছে। আপনাকে বিদ্ধ করা গুলিটি এক-আধ ইঞ্চি পাশে বা নিচে লাগলে ঘটনাস্থলেই আপনার মৃত্যু হতো। কোনোভাবে মেডিকেল আনা গেলেও আমাদের পক্ষে আপনাকে বাঁচানো কঠিন হতো।’

বৈষম্যমূলক কোটা প্রথা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি রাহাত ও তাঁর সহপাঠীরা। কোটার সুযোগ নিয়ে অনেক অযোগ্য মানুষ ভালো চাকরির সুযোগ পাবে, অথচ অধিকাংশ যোগ্য শিক্ষার্থী বঞ্চিত হবে— একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের এ কেমন বিমাতাসূলভ আচরণ? আমরা এ বৈষম্য মেনে নিতে পারছিলাম না, বলেন রাহাত। 

চট্টগ্রামে এ আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তারা শুরুতে এককভাবে আন্দোলন করলেও পরে সেখানে স্কুল কলেজ থেকে শুরু করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হন। তারা দিন দিন আন্দোলনকে তরান্বিত করতে থাকেন। তাদের এই আন্দোলন আস্তে আস্তে স্বৈরশাসকের পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।’

ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা রাহাত জানান, ‘আন্দোলন করতে গিয়ে নিজের শরীরে যে ক্ষত হয়েছে এতে আমার বিন্দু পরিমাণ কষ্ট নেই। কারণ আমাদের কষ্ট সফল হয়েছে। আমাদের যৌক্তিক দাবি পূরণ হয়েছে, স্বৈরচারের পতন হয়েছে।’

তাঁর আশা, মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের উপযুক্ত জায়গায় স্থান পাবে। অন্তর্বর্তী সরকার চাকরির সব বৈষম্য দূর করবে। দেশে বিরাজমান ফ্যাসিবাদী সিস্টেমকে হটিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন— সরকার যেন তাদের এই কষ্ট এবং শ্রম বৃথা যেতে না দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত