ঢাকা থেকে চেন্নাইয়ের ফ্লাইটকে ‘এয়ার অ্যাম্বুলেন্স’ বললেও ভুল হবে না। যাত্রীদের বেশিরভাগই চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ ভারতের এ শহরে আসেন। এখানকার অ্যাপোলো হাসপাতাল, শঙ্কর নেত্রালয় আর একটু দূরেই ভেলোরের সিএমসি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে আসেন বাংলাদেশের অনেক মানুষ। ভারতবর্ষের অন্য অনেক জায়গা থেকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য এখানে পা পড়ে অনেকের। হাসপাতালগুলোর আশপাশের সস্তা লজ আর হোটেলগুলোতে মাসকাবারি বন্দোবস্তে থেকে যান। বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের চেন্নাই আগমনের উদ্দেশ্য অবশ্য একেবারেই আলাদা। চিদাম্বরম স্টেডিয়ামের আশপাশের সরু গলির ভেতরকার সস্তা লজ নয়, তাদের আবাসস্থল আইটিসি চোলা নামের ঝাঁ-চকচকে এক পাঁচতারকা হোটেল। তবে এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মতোই ক্রিকেট খেলতে আসা খেলোয়াড়দের ভেতরও বাসা বেঁধেছে এক রোগ, যার নাম ব্যাটিং বিপর্যয়। পাকিস্তান সফরে টেস্ট সিরিজ ২-০-তে জয়ের কীর্তির আড়ালে যে রোগটা চাপা পড়ে গেলেও ভারত সফরের আগের স্মৃতি ভেসে উঠছে চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে প্রথম বল মাঠে গড়াবার আগে।
অবশ্য তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল একদমই আলাদা। অতিমানবীয় বিশ^কাপের পর ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নিষিদ্ধ হলেন সে সময়কার টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তড়িঘড়ি করে মুমিনুল হককে অধিনায়ক করে নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের জন্য দল ঘোষণা করেন নির্বাচকরা। পুরো ব্যাপারটা এত অকস্মাৎ ছিল যে, নতুন টেস্ট অধিনায়কের জন্য ব্লেজার বানানোরও সময় পায়নি বিসিবি, সেই ব্লেজার পরে ঢাকা থেকে ইন্দোরে বয়ে এনেছিলেন এক সাংবাদিক। একে তো সাকিব নিষিদ্ধ, তার ওপর ব্যক্তিগত কারণে সিরিজ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তামিম ইকবাল। তার ওপর কলকাতায় গোলাপি বলে দিনরাতের টেস্ট, যে অভিজ্ঞতা একদমই ছিল না বাংলাদেশের। ফল দুই টেস্টের চার ইনিংসেই ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়। ১৫০, ২১৩, ১০৬ ও ২৯৬; এই ছিল সবশেষ ভারত সফরের দুই টেস্টের চার ইনিংসে বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ। দুটো ম্যাচই শেষ হয়ে যায় তিন দিনে।
এবার অবশ্য পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে বুকভরা আত্মবিশ^াস নিয়ে ভারতের মাটিতে পা রেখেছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশ দল ঘিরে গণমাধ্যমেও বাড়তি আগ্রহ। মাহমুদুল হাসান জয় কেন একাদশের বাইরে এই নিয়েও প্রশ্ন করলেন এক ভারতীয় সাংবাদিক! আর নাহিদ রানাকে নিয়ে কৌতূহল তো আছেই। সংবাদ সম্মেলনে যেসব প্রথাগত প্রশ্নের কূটনৈতিক জবাব দেন ক্রিকেটাররা, শান্ত সেই চেনা পথের বাইরে হাঁটেননি। বলেছেন ভালো খেলতে চাওয়ার কথা, জিততে চাওয়ার কথা, প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা। এসব নিয়ে বলতে বলতেই বলেছেন, ‘ফল নিয়ে যদি বলেন, পঞ্চম দিনের শেষ সেশনে আমাদের ফল নিয়ে চিন্তা। তার আগপর্যন্ত আমরা নিজেদের শক্তি অনুযায়ী খেলার চেষ্টা করব।’ শান্ত ক্রিকেটের নিয়মের মনোযোগী পাঠক হলেও ইতিহাসের বোধহয় নন, কারণ এখানে পঞ্চম দিনের শেষ বিকেল অবধি খেলা গড়ায় কমই।
স্টিভ ওয়াহর নেতৃত্বে যে দলটা অশ্বমেধের ঘোড়া হয়ে গোটা দুনিয়া বিজয় করে টানা ১৬ টেস্ট জিতে ভারতে পা রেখেছিল, সেই দলটাকে সৌরভ গাঙ্গুলির ভারত রুখে দিয়েছিল এ চেন্নাইতেই। সিরিজের শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে ২ উইকেটে হারিয়ে সিরিজের প্রথম টেস্টে হারের পর তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল ভারত। ডাবল সেঞ্চুরি করা ম্যাথু হেইডেন তার খুবই দামি চুরুটের বাক্স রেখে দিয়েছিলেন সিরিজ জয়ের উদযাপনের জন্য, তাতে আর আগুনের ছোঁয়া লাগেনি। ভারতে এসে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয় স্টিভের কাছে ছিল লাস্ট ফ্রন্টিয়ার, যে লড়াইটা অল্পের জন্য জিততে পারেননি। শান্তও মনে করেন, তাদের জন্যও এ সিরিজটা হবে চরম পরীক্ষা, তবে সেই পরীক্ষা দিতে তারা তৈরি, ‘অবশ্যই! এটা সবচেয়ে কঠিন একটা প্রতিপক্ষ। আমরা সবাই এটা মানি। তবে আসলে প্রতিপক্ষকে নিয়ে বেশি চিন্তা না করে, নিজেদের নিয়ে ভাবা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের কী শক্তিমত্তা আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দলের ওই সামর্থ্য আছে, এখানে ভালো খেলার। পাঁচ দিনের একটা ম্যাচ হয়, পাঁচটা দিন আমরা কীভাবে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি। লক্ষ্য তো একটাই থাকে, আমরা প্রত্যেকটা ম্যাচ জিতব। আমাদেরও লক্ষ্য একই থাকবে, আমরা জেতার জন্যই খেলব। জেতার জন্য যে জিনিসগুলো করার প্রয়োজন, ওই জিনিসগুলো আমরা করব।’
পরীক্ষায় বসার আগে স্পিন বোলিং, পেস বোলিং এবং লোয়ার মিডল অর্ডার ঘিরে পাস নম্বর পাওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে পাকিস্তান সফরের পারফরম্যান্স ঘিরে। কিন্তু শুরুর দিকের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে ফেল করার যথেষ্ট আশঙ্কা। বিশেষ করে খেলাটা যখন এসজি বলে। শান্ত অবশ্য আশ্বস্ত করলেন, পাকিস্তানে কোকাবুরা বলে খেলে আসার পর এসজি বলে যথেষ্ট অনুশীলন করেছেন ব্যাটসম্যানরা, ‘চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। বাংলাদেশে আমরা এসজি বলে অনুশীলন করেছি, এখানে আসার পর এসজি বলে বেশ কয়েকটা সেশন হয়েছে। তো আমার মনে হয়, প্রত্যেকটা ব্যাটসম্যান খুব ভালোভাবে এসজি বলে অ্যাডজাস্ট করে ফেলেছে। ভারতের বোলিং আক্রমণ ভালো অবশ্যই। চ্যালেঞ্জ থাকবেই। তবে এটা নেওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুত। আর আসলে বল নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই, আমার মনে হয়। সবাই অনেক দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য সবারই আছে।’
বল, উইকেট; এসব নিয়ে চিরায়ত সব প্রশ্ন আর সেসবের কূটনৈতিক উত্তরের বাইরে যে ব্যাপারটা, সেটা হচ্ছে চেন্নাইর আবহাওয়া। বঙ্গোপসাগরের তীরের এ শহরের রোদ দেহের ভেতর থেকে প্রতিটি তরলবিন্দুকে যেন নিংড়ে নিতে চায়! লম্বা সময় ফিল্ডিং করা এবং পেসারদের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার জন্য যে আবহাওয়াটা খুবই প্রতিকূল। সকালে উইকেটে একটুও আর্দ্রতা থাকার সম্ভাবনা নেই। এই ম্যাচে যে দল আগে ব্যাটিং করে বড় সংগ্রহ গড়বে, ম্যাচের ভাগ্য হেলে থাকবে তাদের দিকেই। সবশেষ ২০২১ সালে হয়ে যাওয়া ভারত-ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচ দুটির স্কোরকার্ড সেই সাক্ষীই দিচ্ছে। পাকিস্তান সফরে দুটি টেস্টেই বাংলাদেশ ব্যাট করেছে পরে, এখানে টস জিতে আগে ব্যাটিং নিয়ে চতুর্থ ইনিংসে প্রতিপক্ষকে ব্যাটিংয়ে পাঠানোটাই রীতি। আর সেজন্য চাই টপ অর্ডারে বড় রান, বড় ইনিংস। অথচ এ জায়গাতেই বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্বল।