মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নতুন পর্ব

একের পর এক তারহীন যোগাযোগ যন্ত্রের বিস্ফোরণের ঘটনায় অস্থিরতা বিরাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ লেবাননে। গত মঙ্গলবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত কয়েক হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়। এক দিন পর গত বুধবার দেশটিতে একযোগে বিস্ফোরিত হয় ওয়াকিটকি, রেডিও, গাড়ি, ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনের মতো যন্ত্রাংশ। এ হামলার জন্য ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে দায়ী করেছে হিজবুল্লাহ ও লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনী। তবে হামলার বিষয়ে ইসরায়েল কোনো বিবৃতি না দিলেও এটিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নতুন পর্ব শুরু বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট। সংঘাতের এই নতুন পর্ব নিয়ে সংকলনটি করেছেন অপু রায়হান

পেজার বিস্ফোরণ

গত মঙ্গলবার রাজধানী বৈরুতসহ বেশ কয়েকটি শহরে তারহীন যোগাযোগ যন্ত্র পেজারের বিস্ফোরণের ঘটনায় কেঁপে ওঠে লেবানন। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেলে প্রথম পেজার বিস্ফোরণের পর থেকে ঘণ্টাব্যাপী দেশের বিভিন্ন স্থানে সেগুলো বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে থাকে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সুরক্ষিত রাখতে বার্তা আদান-প্রদানের জন্য এই পেজার ব্যবহার করত ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এ হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়। আহত হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে দুই শতাধিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলায় আহত হয়েছেন লেবাননে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মুজতাবা আমানি।

পাঁচ মাস আগে তাইওয়ানের গোল্ড অ্যাপোলো কোম্পানি থেকে পাঁচ হাজার পেজার কিনেছিল হিজবুল্লাহ। পেজারগুলোর বেশিরভাগই ছিল এপি৯২৪ মডেলের। তবে গোল্ড অ্যাপোলোর দাবি, বিস্ফোরিত পেজারগুলো তাদের উৎপাদিত নয়। ‘বিএসি’ নামে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান সেগুলো তৈরি করেছে। তাদের গোল্ড অ্যাপোলোর ব্র্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি ছিল। সামরিক কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রতিটি পেজারের ব্যাটারির পাশে এক থেকে দুই আউন্স পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত ছিল। দূর থেকে যেন তা বিস্ফোরিত করা যায়, তা নিশ্চিত করতে সেখানে একটি বোর্ডও সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নজরদারি এড়াতে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা যোগাযোগের জন্য পেজার ব্যবহার করতেন।

ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ

পেজার বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলানোর আগেই লেবানন ছুড়ে বিস্ফোরিত হতে থাকে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত আরেকটি তারহীন যোগাযোগ যন্ত্র ওয়াকিটকি। লেবাননের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রাজধানী বৈরুত, বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবানন জুড়ে তাদের সদস্যদের ব্যবহার করা কয়েকশ ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটে। পেজার বিস্ফোরণে নিহতদের জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীটির আয়োজিত শোকপ্রকাশের অনুষ্ঠানেও ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের মধ্যে। তখন পর্যন্ত বিস্ফোরিত না হওয়া ওয়াকিটকি থেকে দ্রুত ব্যাটালি খুলে ফেলেন হিজবুল্লাহর সদস্যরা। পরে সেগুলোকে ধাতব ব্যারেলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছেন, দেশজুড়ে ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৪৫০ জন। বিস্ফোরিত ওয়াকিটকিগুলো জাপানভিত্তিক রেডিও যোগাযোগ সরঞ্জাম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘আইকম’ এর তৈরি। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা প্রায় ১০ বছর আগে হামলায় ব্যবহৃত ‘ভিসি-ভি৮২’ মডেলের এসব ওয়াকিটকির উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই এটি আমাদের কোম্পানি থেকে পাঠানো হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

ল্যাপটপ-মোবাইল ফোন ও অন্যান্য

তবে শুধু পেজার ওয়াকিটকির মধ্যেই এই হামলা সীমিত থাকেনি। বুধবার ওয়াকিটকি বিস্ফোরণের পর ল্যাপটপ, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও গাড়ি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি এ হামলা থেকে বাদ যায়নি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও। এসব যন্ত্রাংশ বিস্ফোরণের ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দেশটির বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে। হতাহতের ঘটনায় আহতদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। কিছু কিছু জায়গায় গাড়ি বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে সেগুলো ত্রুটিজনিত কারণে নাকি এর ভেতরে থাকা কোনো যন্ত্রের কারণে বিস্ফোরিত হয়েছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যেসব যন্ত্রে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেগুলো মূলত যোগাযোগের কাজে ব্যবহৃত হয়, তেমন সব যন্ত্রে এসব বিস্ফোরণ ঘটেছে। লেবাননের রেড ক্রস জানিয়েছে, বিস্ফোরণ-আক্রান্ত এলাকাগুলোয় কাজ করছে ৩০টি অ্যাম্বুলেন্স টিম।

প্রতিক্রিয়া

লেবাননে এ অভিযানের বিষয়টি আগে থেকেই জানত যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আগেই এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে অবগত করেছিল। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনএন। এমনকি মঙ্গলবার সকালে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয় বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে। তবে অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ইসরায়েল। তাই অভিযানটি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা অন্ধকারে ছিলেন বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা মুখপাত্র জন কিরবি।

এদিকে ইসরায়েল হামলার দায় স্বীকার না করলেও, এটিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নতুন পর্ব শুরু বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট। ইসরায়েলের একটি বিমানঘাঁটি পরিদর্শনের সময় এ মন্তব্য করেন তিনি। গ্যালান্ট বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা পর্বে রয়েছি। এখন আমাদের দরকার সাহস, সংকল্প ও উদ্যম।’ সেই সঙ্গে লেবাননে এ বিস্ফোরণে পর উত্তরাঞ্চলীয় লেবানন সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে ইসরায়েল।

হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বনেতারা। ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে গোটা মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি। গাজা যুদ্ধকে ইসরায়েল লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে বলে মন্তব্য করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিবসহ অন্যান্য বিশ্বনেতাও।

অভিযোগের তীর

গত দুদিনের এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় ইসরায়েলকে দায়ী করেছে হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকার। ইসরায়েল এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। এসব হামলার কারণে ইসরায়েলকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে এই সংঘাত নতুন নয়। প্রায় চার দশক ধরে চলা এই সংঘাতের মধ্যে সাম্প্রতিক এই হামলা সে সংকটাবস্থাকে আরও করুণ অবস্থার দিকে ধাবিত করল। এই বিস্ফোরণের ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানপন্থি গোষ্ঠীটির উত্তেজনা আরও তীব্র হয়ে উঠছে। যা মধ্যপ্রাচ্যের এক বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলল। ১৯৮২ সালে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থার পিএলওর হামলার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল লেবাননে আক্রমণ করলে এই লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে ফিলিস্তিনে যুদ্ধে হামাসকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে আসছে হিজবুল্লাহ।

তবে দুপক্ষের এ সংঘাত বাড়লে তা লেবাননের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়সহ নানা সংকটে জর্জরিত দেশটি। বিস্ফোরণের ঘটনার জবাবে গত বুধবার দেশটির উত্তরের সীমান্ত অঞ্চল ও ইসরায়েলের অধিকৃত গোলান মালভূমিতে রকেট হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লেবানন থেকে প্রায় ৩০টি রকেট সীমান্ত অতিক্রম করে ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। তবে এসব হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে তেল আবিব। উল্টো লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর ছয়টি স্থাপনা ও একটি অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী।

মোসাদের সংশ্লিষ্টতা

লেবাননে হামলার বিষয়ে সরাসরি অভিযুক্ত হলেও, এখনো নিশ্চুপ ইসরায়েল। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সামরিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মত, ভয়াবহ এই হামলার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ। বিস্ফোরিত ওয়াকিটকি ও পেজারগুলো চলতি বছরের শুরুর দিকে লেবাননে পৌঁছায়। তবে সেটি হিজবুল্লাহর হাতে যাওয়ার আগে চালানটি মোসাদের কারসাজিতে পড়েছিল। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেশটিতে এ হামলা চালিয়েছে মোসাদ।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়া বলেন, হিজবুল্লাহ ও লেবাননের সমাজের ভেতর সফলভাবে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে ইসরায়েল। তিনি বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো লেবাননের মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি করে সম্ভাব্য তৃতীয় দফা হামলার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

তবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন গুপ্ত হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রথম নয়। ১৯৯৬ সালে হামাস বোমা প্রস্তুতকারক ইয়াহিয়া আয়্যাশকে একটি বিস্ফোরক যুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে হত্যা করা হয়েছিল। এমনকি চলতি বছরের জুনে তেহরানে হামাসের সাবেক প্রধান ইসমাইল হানিয়ার মৃত্যুতেও মোসাদের চক্রান্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের নতুন রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তেহরানে অবস্থানরত হানিয়ার গেস্ট হাউজের বিস্ফোরণ ঘটনার পেছনে মোসাদের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা তাই উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

আশঙ্কা

লেবাননে সাম্প্রতিক এই ডিভাইসের বিস্ফোরণের ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়া হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী শক্তিদের সঙ্গে জোট বেঁধে তেল আবিবে সম্মিলিত আক্রমণ চালালে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের সূচনা করবে। এতে উভয় পক্ষেরই বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ-হুতি-হামাসের সশস্ত্র আক্রমণ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরের অচলাবস্থার আরও অবনতি হতে পারে বলে শঙ্কা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।