অবশেষে প্রমাণিত হলো চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব ও বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের অনিয়ম। তিনি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব থাকাকালে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফলে জালিয়াতি করে জিপিএ ৫ পাইয়ে দিয়েছেন। এ নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের শৃঙ্খলা শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শতরূপা তালুকদার স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে নারায়ণ চন্দ্র নাথকে ওএসডি করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে এবং ফল জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে গত বছর ৬ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে সর্বপ্রথম ‘সচিবের ছেলের পুনঃনিরীক্ষণ আবেদনের রহস্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এ ছাড়া গত ১০ মার্চ ‘পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের চিরকুট ফাঁস’ শীর্ষক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছিল দেশ রূপান্তরে। সেই রিপোর্টের পর অন্যান্য মিডিয়ায়ও নারায়ণ চন্দ্র নাথের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছিল। পরবর্তীকালে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও গত ৪ আগস্ট তদন্ত রিপোর্ট জমাদানের পর এ ব্যবস্থা নিল মন্ত্রণালয়।
প্রফেসর নারায়ণের বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার কথা জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের। আমরা শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে এখন সেই অনুযায়ী এগোব।’ তিনি আরও বলেন, ‘নারায়ণ ইস্যুতে যখন বোর্ড অস্থির তখন সরকারের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ার পর আমি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটিকে সব ধরনের উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করি। একই সঙ্গে বোর্ডের সুনাম রক্ষার্থে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং এর ফলে তদন্ত কমিটি সত্য বের করে আনতে সক্ষম হয়।
শিক্ষা বোর্ডের ইতিহাসে এত বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তির অনিয়মের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে না। আমি শিক্ষা বোর্ডের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কাজ করেছি।’ তার ছেলের ফল বাতিল হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর রেজাউল করিম বলেন, ‘বিষয়টি বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটিতে উত্থাপিত হবে। কমিটি সিদ্ধান্ত দেবে। তবে এ ধরনের ঘটনায় ফল বাতিল হয়ে থাকে।’
উল্লেখ্য, এর আগে ১৯৯৮ সালে বাইরে থেকে লিখে খাতা জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে। ফল প্রকাশের পর ওই শিক্ষার্থী মেধা তালিকায় স্থান পান। কিন্তু জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশের পর তার ফল বাতিল হয়েছিল।
১১ বিষয়ের নৈর্ব্যক্তিক ও রচনামূলকে নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিল নারায়ণ : নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সেবার পরীক্ষায় শুধু বাংলা ছাড়া বাকি সব বিষয়ে জিপিএ ৫ পেলেও সামগ্রিক ফলে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিল নক্ষত্র দেবনাথ। কিন্তু অভিযোগ ছিল নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে বাস্তবে এই ফল পায়নি। ফলে জালিয়াতি করে নম্বর বাড়ানো হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে উঠে এসেছে উত্তরপত্রের প্রাপ্ত নম্বর ও অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টে থাকা প্রাপ্ত নম্বরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক হয়ে উত্তরপত্রের যে প্রাপ্ত নম্বরটি বোর্ডের কম্পিউটার শাখায় স্ক্যানিং করা হয়েছে, এই নম্বর ও অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টে উল্লেখ করা নম্বরের মধ্যে মিল নেই বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির তথ্যানুসারে জানা যায়, ১৩ বিষয়ের এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যে ১১ বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর পরিবর্তন করেছিল নারায়ণ চন্দ্র নাথ। নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে বাংলা প্রথম পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ২৪, কিন্তু প্রকাশিত ফলে উল্লেখ করা হয়েছে ২৬, রচনামূলকে পেয়েছিল ৩১, ফলে উল্লেখ করা হয়েছে ৪১। ইংরেজি প্রথম পত্রের রচনামূলকে পেয়েছিল ৭০, ফলে উল্লেখ করা হয়েছে ৮০। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে রচনামূলকে পেয়েছিল ৫৭, উল্লেখ করা হয়েছে ৮১। পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের রচনামূলকে পেয়েছিল ৩৪, উল্লেখ করা হয়েছে ৪২। পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ২০, উল্লেখ করা হয়েছে ২২। রসায়ন প্রথম পত্রে নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ২০, উল্লেখ করা হয়েছে ২৩, রচনামূলকে পেয়েছিল ৩০, উল্লেখ করা হয়েছে ৪০। রসায়ন দ্বিতীয় পত্রে নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ১৯, উল্লেখ করা হয়েছে ২৩। জীববিজ্ঞান রচনামূলকে পেয়েছিল ২৯, উল্লেখ করা হয়েছে ৩৯। উচ্চতর গণিত প্রথম পত্রে নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ১১, উল্লেখ করা হয়েছে ২২। উচ্চতর গণিত দ্বিতীয় পত্রে রচনামূলকে পেয়েছিল ২৮, উল্লেখ করা হযেছে ৩৫। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নৈর্ব্যক্তিকে পেয়েছিল ২২, উল্লেখ করা হয়েছে ২৫, রচনামূলকে পেয়েছিল ২৭ কিন্তু উল্লেখ করা হয়েছে ৪৫।
এসব নম্বর কীভাবে বাড়ানো হয়েছিল : এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যেহেতু নারায়ণ চন্দ্র নাথ বোর্ডের সচিব ছিলেন, তাই তিনি নিজ ক্ষমতাবলে বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্টের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন করেছেন। এ ছাড়া উত্তরপত্র যাতে পাওয়া না যায়, সেজন্য বোর্ডের আদেশ অমান্য করে তিনি রচনামূলক অংশের কিছু কিছু বিষয়ের উত্তরপত্র বিক্রি করে দিয়েছিলেন বলে তদন্ত কমিটির রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত : চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সচিব এবং বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। শুধু বাংলা বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে সে জিপিএ ৫ পান। কিন্তু চতুর্থ বিষয়ে জিপিএ ৫ পাওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে সে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। কিন্তু বাংলায় জিপিএ ৫ না পাওয়ায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে বোর্ডের নিয়মানুযায়ী পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে গেলে দেখতে পান কে বা কারা আগে থেকে সব বিষয়ের জন্য পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে রেখেছেন। এতে নিজের সন্তানের জন্য শঙ্কিত হয়ে ছেলের পক্ষে তার মা বনশ্রী নাথ পাঁচলাইশ থানায় গত বছর ৪ ডিসেম্বর জিডি করেন। সেই জিডিতে কে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন, তা বের করার আবেদন জানানো হয়। পাঁচলাইশ থানা পুলিশ তদন্ত করে দেখতে পায়, পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনে রেফারেন্স মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুল আলীমের মোবাইল নম্বর। এ ঘটনায় প্রফেসর আবদুল আলীমকে পুলিশ ডেকেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘কে বা কারা আমার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন করেছেন আমি জানি না।’ উপরন্তু তিনি এতে প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র নাথকে দায়ী করে পাল্টা আরেকটি জিডি করেছিলেন কোতোয়ালি থানায়। পরে পুলিশ জিডির রিপোর্ট সাবমিট করার পর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে কাউন্টার টেরিজম ইউনিটে মামলা করেন বনশ্রী নাথ। আর এতে প্রফেসর আবদুল আলীম ও বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মুহম্মদ ইদ্রিস আলীকে আসামি করা হয়। এর আগে নক্ষত্র দেবনাথের ফল যাতে পুনঃনিরীক্ষণ না হয়, সেই নির্দেশনা দেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মুজিবর রহমান। তিনি শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদকে চিরকুটের মাধ্যমে এই শিক্ষার্থীর পুনঃনিরীক্ষণ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। আর এতে নক্ষত্র দেব নাথের ফল পুনঃনিরীক্ষণ হয়নি।
তদন্ত কমিটি গঠন : গত ১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা বিভাগের উপসচিব শাহীনুর ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগকে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত করে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার ফল তৈরি এবং নানা বিষয়ের কারণে তদন্ত কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার পর গত ৪ আগস্ট তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল তদন্ত কমিটি।