সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন ডিসেম্বরের মধ্যে

সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন ডিসেম্বরের মধ্যে কমিশন প্রধানরা সরকারকে জমা দিবেন বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল।

সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত ছয় সংস্কার কমিশনের প্রধানদের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রথম বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে সন্ধ্যায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান আইন উপদেষ্টা।

সাংবাদিকদের আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘বৈঠকে প্রধানত আলোচনা হয়েছে সংস্কার ভাবনা নিয়ে। কমিশনগুলো কীভাবে কাজ করতে চায়, কর্মপদ্ধতি কী হবে, সদস্য বাছাইয়ের প্রক্রিয়া কী হবে, কবে প্রতিবেদন দেবেন। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা পেশাজীবী সংগঠন আছে, তাদের অংশগ্রহণ কীভাবে হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

বৈঠকে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘কমিশনগুলো ১ অক্টোবরের মধ্যে কাজ শুরু করবে। আশা করছি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে একটি প্রতিবেদন জমা দেবে। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে দ্বিতীয় ধাপে উপদেষ্টামণ্ডলীর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করবে। এরপর আরও বৃহৎ আকারে আলোচনা হবে, সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেগুলো অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সবার মতামতের প্রতিফলন করার চেষ্টা করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটা ছিল একটা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। বাংলাদেশে যেন আর কোনো দিন, কখনো ফ্যাসিবাদী শাসন জাঁকিয়ে উঠতে না পারে সেটা রোধ করতে কী কী সংস্কার প্রয়োজন, সে লক্ষ্য নিয়ে সংস্কার কমিশন প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেছে।’

সংবিধান সংস্কার কী প্রক্রিয়ায় হবে এমন প্রশ্নে আসিফ নজরুল বলেন, ‘সংবিধান কীভাবে হবে সেটা বলে দিলে আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না। কমিশন গঠন করা হয়েছে তারা সব সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হবে। সেটা গণভোট কিংবা গণপরিষদের মাধ্যমে হতে পারে। গণপরিষদ সংবিধান তৈরি করতে বা গ্রহণ করতে পারে। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের কাজ চলতে পারে। কী হবে? সে সিদ্ধান্ত আমরা নেব না, সেটা নেবে বাংলাদেশের জনগণ। জনগণের পক্ষে কাজ করার জন্য এ কমিশন গঠন করা হয়েছে। সেখানে সমাজের সব স্তরের মানুষের মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা হবে।’

এ উপদেষ্টা বলেন, ‘যারা গণহত্যাকারী ছিল, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, আমাদের প্রায় অন্তত এক হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। আরও অনেক অনেক মানুষকে গুরুতর আহত করেছে, চক্ষুহীন করেছে এবং যারা বিচারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না।’

ছয়টি ছাড়া আরও সংস্কার কমিশন গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম বলেন, পরবর্তীকালে আরও সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব টেবিলে আছে।

ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা একটা কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে ছিলাম। বিভিন্নভাবে বঞ্চিত হয়েছি। ভোটাধিকার থেকে শুরু করে বহুক্ষেত্রে বঞ্চনা। এটার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এজন্য কতগুলো পরিবর্তন আনতে হবে। কতগুলো সংস্কার করতে হবে। আমাদের প্রতিবেদনে উপদেষ্টা পরিষদ কী আশা করছে, সেটা বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অচিরেই ভারত থেকে ফেরত চাওয়া হবে। আমাদের সঙ্গে ভারতের এক্সট্রাডিশন ট্রিটি আছে। সে অনুযায়ী ভারতে যদি আমাদের কোনো কনভিকটেড ব্যক্তি থাকে, তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোন আর যাই হোন, ওনার প্রত্যর্পণ আমরা চাইতে পারি।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের সময় ঘটে যাওয়া গণহত্যার বিচারের লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে।’

আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে দ্রুত জানানো হবে বলেও আসিফ নজরুল উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইনভেস্টিগেশন এবং প্রসিকিউশন টিম এরই মধ্যে গঠন করা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ চৌধুরী, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রধান বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মমিনুর রহমান, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। আর অনলাইনে যুক্ত ছিলেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

এ ছাড়া সরকারের পক্ষে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

অন্তর্র্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন : অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টাদের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা, পদত্যাগ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান করতে ‘অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪’ খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক দমন-পীড়ন ও গণহত্যা চালানোর ফলে সারা দেশে দল-মত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতা উত্তাল গণবিক্ষোভ করে। আন্দোলনের একপর্যায়ে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে সরকার পতনের একদফা দাবিতে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। পরদিন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি।

এতে আরও বলা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখা এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার জন্য অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠন বিষয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মতামত যাচাই করেন। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৮ আগস্ট স্পেশাল রেফারেন্স নম্বর- ০১/২০২৪ দ্বারা মতামত দিয়েছে, ‘রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্র্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি উক্তরূপে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্য উপদেষ্টাদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন।’

এমন পরিস্থিতিতে ডকট্রিন অব নেসেসিটি অনুসারে সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় সর্বস্তরের জনগণের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও পরম অভিপ্রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে, গণ-অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এবং ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের রাষ্ট্র সংস্কার আকাক্সক্ষা পূরণের এবং রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ৮ আগস্ট অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব, প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টাদের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা, পদত্যাগ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে বিধান করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ ‘অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে।

এদিকে এদিকে অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪-এর খসড়ার অনুমোদনও দিয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন-পূর্বক উপদেষ্টা পরিষদ বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়।

অন্তর্র্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যারা সরকার অথবা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত, তারা প্রতিবছর আয়কর জমা দেওয়ার সর্বশেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নীতিমালায় সংযুক্ত ছকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের আয় ও সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান রেখে খসড়া ‘আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা’ উপদেষ্টা পরিষদ-বৈঠকে অনুমোদিত হয়।