রাজধানীর পল্টনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়ানো নিয়ে দুই খতিবের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে মসজিদের গেটের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় মুসল্লিসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে মসজিদে পুলিশ মোতায়েন করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।
নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিরা জানান, নামাজ শুরুর আগে খতিব আবু সালেহ আহম্মেদ পাটোয়ারী বয়ান করছিলেন। এমন সময় পালিয়ে যাওয়া খতিব মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন ও তার অনুসারীরা এসে জুমার নামাজ পড়ানোর জন্য বয়ানকারী খতিবের কাছ থেকে মাইক্রোফোন নিয়ে যান। এ সময় দুই খতিবের অনুসারীদের মধ্যে মারামারি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ গেটের কয়েকটি দরজার গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়।
এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই খতিবের অনুসারীরা মসজিদের ভেতরে থাকা জুতার বক্স ও বক্সে থাকা জুতা, কার্পেটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম একে অপরের দিকে ছুড়ে মারছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেক মুসল্লি মসজিদ থেকে বের হয়ে যান।
রাসেল নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী মুসল্লি বলেন, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সাবেক ইমাম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে কিছু মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও কয়েকজন ব্যক্তি বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর মিম্বরের কাছাকাছি স্থানে অবস্থান করা মুসল্লি ও খাদেমদের ওপর হামলা চালান। এতে মসজিদ জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থমথমে পরিস্থিতিতে নামাজ শেষে সাধারণ মুসল্লিরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু হঠাৎ দেখা যায় মসজিদ থেকে সেøাগান দিতে দিতে একদল মুসল্লি বের হন। তারা ‘একটা একটা লীগ ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’ বলে সেøাগান দিচ্ছিলেন। এ সময় পুলিশ তাদের মসজিদ এলাকা থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু তারা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ান। পরে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেন।
তিনি আরও বলেন, মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এমন হামলার ঘটনা ন্যক্কারজনক। সাবেক ইমাম যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বসে সমস্যা সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু তিনি লোকজন নিয়ে এসে হামলা চালান যে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ করেছেন।
বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়ানোকে কেন্দ্র করে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে সেটাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে পলিয়ে যাওয়া খতিব রুহুল আমিন দাবি করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এখনো বায়তুল মোকাররমের খতিব। সরকার এখনো আমার নিয়োগ বাতিল করেনি। অসুস্থতার কারণে কয়েক সপ্তাহ আসতে পারেননি। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত ছুটিও নিয়েছেন। আজ (শুক্রবার) ছুটি শেষ হওয়ায় নামাজ পড়াতে আসছিলাম।’
তিনি জানান, মসজিদে যাওয়ার পর মুসল্লি কমিটির পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তাকে বলেন, নামাজ না পড়ানোর জন্য। কিন্তু তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ আমাকে নামাজ না পড়াতে বললে চলে যাব। এরপর মুফতি রুহুল আমীন নামাজের জন্য বয়ান শুরু করেন এবং প্রায় ২০ মিনিট বয়ানও করেন। এ সময় মসজিদের বাইরে থেকে কিছু লোক এসে হট্টগোল শুরু করে এবং মসজিদে ভাঙচুর চালায়। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি নামাজ না পড়িয়ে চলে যান।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে খতিবের নামাজ পড়ানো না পড়ানোর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য না থাকায় এই বিশৃঙ্খলা হয়েছে বলে মনে করছেন মুফতি রুহুল আমিন।
সংঘর্ষের পর গতকাল বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়ান আবু সালেহ আহম্মেদ পাটোয়ারী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বায়তুল মোকাররমে নতুন করে কোনো খতিব নিয়োগ দেওয়া হয়নি। মাস হিসাবে চার জুমায় চারজন খতিব জুমার নামাজ পড়াবেন। সেই হিসাবে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। কিন্তু কোনো কিছু না জানিয়ে খতিব রুহুল আমিন এলে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে খতিব নিয়োগ দিয়ে এই সমস্যা সমাধানের জোর দাবি জানাই।
এদিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে মুসল্লিদের মধ্যে মারামরির ঘটনায় আহত অন্তত ছয়জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিছেন হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাসুদ আলম। আহতরা হলেন মোস্তাইন বিল্লাহ (১৭), লিমন (১৩), এনামুল হাসান (১৬), শাকিল (২১), ফেরদৌস (২২) ও হাবিবুর রহমান (২০)।
আহত এনামুল হাসান জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লার একটি মাদ্রাসার ছাত্র। তারা তিন ছাত্র জুমার নামাজ পড়তে বায়তুল মোকাররমে এসেছিলেন। মসজিদটির বারান্দায় নামাজ আদায় করছিলেন তারা। হঠাৎ ভেতরের অংশে মারামারি শুরু হয়। সেখান থেকে কোনো কাচের টুকরো হাতে এসে লাগে তার।
সংঘর্ষের বিষয়ে গতকাল রাতে পল্টন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোল্লা মো. খালিদ হোসেন জানান, এ ঘটনায় এখনো কেউ অভিযোগ করেনি।