মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম শান্তি সংগঠন হিলফুল ফুজুল। অনেকেই মনে করেন, অশান্তি ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংগঠন রাসুল (সা.) যুবক বয়সে নিজে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনেক বই-পুস্তকে এমনই লেখা আছে। কিন্তু গ্রহণযোগ্য সিরাতের কিতাব বলছে ভিন্ন কথা। সেখানে উল্লেখ আছে, রাসুল (সা.) নিজে এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। বরং আবরের অন্যান্য সচেতন ব্যক্তিবর্গ এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, রাসুল (সা.) ছিলেন সেই সংগঠনের একজন জোরালো সমর্থক।
গল্পটা শুরু থেকে বলা যাক। জাবিদ গোত্রের এক ব্যবসায়ী একবার কিছু পণ্য নিয়ে মক্কায় আসেন। আস বিন ওয়াইল সাহমি তার সব পণ্য কিনে নেন। তিনি কুরাইশের অনেক বড় নেতা ছিলেন। এই দম্ভে ওই ছোট ব্যবসায়ীর পাওনা অর্থ পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকেন। অনেক আবেদন করার পরও কোনো ভ্রুক্ষেপ করলেন না। বঞ্চিত ব্যবসায়ী কয়েকজনের সাহায্য চাইলেন। তারা সাহমির প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা ভেবে কেউ এগিয়ে এলো না। বরং উল্টো ওই ব্যবসায়ীকে প্রাণনাশের হুমকি দিল। এমন অসহায় পরিস্থিতিতে জাবিদ গোত্রের ব্যবসায়ী হতাশ হয়ে পড়লেন। পরদিন সূর্যোদয়ের সময় তিনি আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চকণ্ঠে মানুষের কাছে সাহায্য চাইলেন। তার কান্নাজড়িত ফরিয়াদ শুনে নবীজির চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ কয়েকজনকে নিয়ে আস ইবনে ওয়ালিদ সাহমির কাছে আসেন এবং তার থেকে ব্যবসায়ীর মূল্য আদায় করে নিয়ে ব্যবসায়ীকে বুঝিয়ে দেন। (তাকাকাতে ইবনে সাদ ১/১২৬-১২৭)
সিরাত ও ইতিহাসের কিতাবে আরও উল্লেখ রয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন তাদের সবার জন্য ভোজের আয়োজন করেন। সেখানে দেশের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য সবাই মিলে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হন এবং হিলফুল ফুজুল নামে একটি সংগঠনের গোড়াপত্তন করেন। সেখানে কয়েকটি বিষয়ে তারা একমত হন। এ চুক্তি সম্পাদনের সময় নবীজিও আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির শর্তগুলো ছিল এমন এক. দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। দুই. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা। তিন. অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা। চার. দুর্বল, অসহায় ও এতিমদের সাহায্য করা। পাঁচ. বিদেশি ব্যবসায়ীদের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ছয়. সর্বোপরি সব ধরনের অন্যায় ও অবিচার অবসানের চেষ্টা করা। এই কথাগুলোর ওপরে সবাই মিলে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম ১০৬)
রাসুল (সা.) একবার সাহাবায়ে কেরামকে বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে আমি এমন একটি মৈত্রীচুক্তির মধ্যে শরিক ছিলাম যে, এর বিনিময়ে আমি লাল উটও গ্রহণ করা পছন্দ করতাম না। যদি ইসলাম আসার পরও এমন কোনো চুক্তিতে আমাকে ডাকা হতো তবে আমি সে ডাকে সাড়া দিতাম।’ (সিরাতে ইবনে হিশাম ১/১৫৪-১৫৫) নবীজির কথার দ্বারাও দলিল পাওয়া গেল যে, তিনি এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না, বরং একজন সমর্থক হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্ন হতে পারে, মহানবী (সা.) কর্র্তৃক এটি প্রতিষ্ঠিত ছিল না; বরং তিনি এটার সমর্থক ছিলেন, এটা নিয়ে এত ঘাঁটাঘাঁটি করার প্রয়োজন কী? প্রথম কথা হলো, পৃথিবীতে মানুষের কল্যাণে প্রথম সংগঠন হিলফুল ফুজুল, সে ব্যাপারে আমরা অবশ্যই সত্যটা জানতে চাই। সঠিক তথ্য স্পষ্ট করতে চাই। দ্বিতীয় কথা হলো, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আমার নামে মিথ্যা বলবে না, কারণ যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।’ (বুখারি)