মাদকের ভয়াবহ পরিণতি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০২:০৭ এএম

মানবজীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সুস্থ বিবেক, পবিত্র চরিত্র ও সঠিক চিন্তাশক্তি। মানুষ যখন তার বিবেককে জাগ্রত রাখে, তখন সে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে পারে এবং সমাজে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এমন কিছু বিষয় আছে, যা মানুষের বিবেককে ধ্বংস করে দেয়, তার আত্মাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে এবং তাকে ধীরে ধীরে সব অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। মাদক তার অন্যতম ভয়াবহ উদাহরণ। ইসলাম তাই মাদককে সমাজ ও মানবতার জন্য ভয়ংকর অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ইসলামের ইতিহাসে একটি শিক্ষণীয় ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। এক ইবাদতকারী ব্যক্তি ছিলেন, যিনি দীর্ঘদিন আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। অবশেষে শয়তান মানুষের রূপ ধরে তার কাছে এসে তিনটি প্রস্তাব রাখে। ব্যভিচার, হত্যা অথবা মদ পান। লোকটি প্রথম দুটি পাপকে ভয়াবহ মনে করে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু সে ভাবল, ‘মদ পান তো তুলনামূলক ছোট পাপ।’ তাই সে মদ পান করল। কিন্তু মদ পান করার পর তার বিবেক লোপ পেল। ফলস্বরূপ সে ব্যভিচারেও জড়িয়ে পড়ল এবং পরে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধও করে ফেলল। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মাদক এমন এক ভয়ংকর দরজা, যা খুলে গেলে একের পর এক পাপ ও অপরাধ প্রবেশ করতে থাকে।

এ কারণেই মদকে ‘উম্মুল খাবায়েস’ বা সব অপকর্মের জননী বলা হয়েছে। কারণ মাদক মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। একজন সুস্থ মানুষ যে কাজের কল্পনাও করতে পারে না, মাদকাসক্ত ব্যক্তি সেই কাজ অনায়াসে করে ফেলে। সে নিজের পরিবার, সমাজ, এমনকি নিজের জীবনকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

মাদকের প্রথম আঘাত পড়ে মানুষের বিবেক ও চিন্তাশক্তির ওপর। মানুষ তখন আর ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে না। তার লজ্জাবোধ কমে যায়, আত্মসম্মান নষ্ট হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে সে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। চুরি, ছিনতাই, ব্যভিচার, খুন, পারিবারিক সহিংসতা এসব অপরাধের পেছনে মাদকের ভূমিকা অত্যন্ত ভয়াবহ। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের নেশার টাকা জোগাড় করতে যেকোনো অন্যায় করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবারকেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। পরিবারে শান্তি নষ্ট হয়, দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয়, সন্তানরা অবহেলিত হয়। অনেক শিশু তার বাবার মাদকাসক্তির কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং সমাজে অসহায় হয়ে বড় হয়। একজন মাদকাসক্ত পিতা বা ভাই পরিবারের সম্মান ধ্বংস করে দেয়। ঘরের স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়, জমিজমা নষ্ট হয়, সংসারে অভাব-অনটন নেমে আসে। ফলে একটি সুন্দর পরিবার ধীরে ধীরে অন্ধকারে তলিয়ে যায়।

সমাজের ওপরও মাদকের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি সমাজে যখন মাদকের বিস্তার ঘটে, তখন সেখানে অপরাধ বৃদ্ধি পায়, যুবসমাজ ধ্বংস হয় এবং নৈতিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ে। যুবকরাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু মাদক সেই ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে দেয়। যে যুবক একদিন দেশ ও জাতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সে মাদকের নেশায় নিজের জীবনটাই নষ্ট করে ফেলে। তার মেধা, শক্তি ও সম্ভাবনা সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে জাতি হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

শারীরিক দিক থেকেও মাদক অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি মানুষের মস্তিষ্ক, লিভার, হৃদপিণ্ড ও স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং অনেক সময় সে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, মাদক মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

ইসলাম মানবকল্যাণের ধর্ম। তাই ইসলাম এমন সব জিনিস নিষিদ্ধ করেছে, যা মানুষের জীবন, বিবেক ও সমাজকে ধ্বংস করে। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্যনির্ধারক তীর ঘৃণিত শয়তানি কাজ। তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা মায়েদা ৯০)

এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ এগুলো মানুষের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই হারাম।’ এই হাদিসের মাধ্যমে ইসলাম কেবল মদ নয়, বরং সব ধরনের মাদককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কারণ নেশার প্রকৃতি একটাই, এটি মানুষের বিবেক ধ্বংস করে এবং তাকে পাপের পথে নিয়ে যায়।

বর্তমান যুগে মাদক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক তরুণ মাদকের ফাঁদে আটকা পড়ছে। কৌতূহল, খারাপ বন্ধু, হতাশা বা আধুনিকতার ভুল ধারণা থেকে তারা মাদক গ্রহণ শুরু করে। কিন্তু শুরুটা যত সহজ মনে হয়, শেষটা তত ভয়াবহ হয়। এক সময় তারা মাদকের দাসে পরিণত হয় এবং জীবন থেকে সব সুখ-শান্তি হারিয়ে ফেলে।

তাই মাদক প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবারে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে, তাদের ভালো বন্ধু নির্বাচন করতে উৎসাহিত করতে হবে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে। সমাজের আলেম, শিক্ষক ও সচেতন ব্যক্তিদের মাদকের ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে। রাষ্ট্রকে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যুবসমাজকে খেলাধুলা, শিক্ষা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করতে হবে।

লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত