রসিকতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ। ইসলামও পরিমিত ও শালীন রসিকতাকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং এটাকে বৈধতার স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে যখন রসিকতার ছলে মিথ্যা, মনগড়া কাহিনি বা বিভ্রান্তিকর কথা বলা হয় তখন তা গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই রসিকতার ছলেও মিথ্যা বলা যাবে না।
বর্তমান সময়ে মিথ্যাভিত্তিক রসিকতা যেন এক ধরনের শিল্পে পরিণত হয়েছে। মানুষকে হাসানোর জন্য চমৎকার উপস্থাপনা ও আকর্ষণীয় বর্ণনার মাধ্যমে অসত্য কথাকে পরিবেশন করা হয়, আর শ্রোতারাও বিনা দ্বিধায় তা গ্রহণ করে। অথচ মুমিনের চরিত্র সত্যনিষ্ঠতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই সাময়িক হাসি-আনন্দের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া কখনোই প্রশংসনীয় নয়, বরং তা বর্জন করাই একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন। এ ছাড়াও ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে পথপ্রদর্শন করেন না, যে সীমা লঙ্ঘনকারী ও চরম মিথ্যাবাদী।’ (সুরা গাফির ২৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কৌতুকের ছলে মিথ্যা বলাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হাদিসে এসেছে, ধ্বংস সেই ব্যক্তির জন্য, যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে নেয় মিথ্যার আশ্রয়। তার জন্য ধ্বংস! তার জন্য ধ্বংস।’ (সুনানে আবু দাউদ)
হাদিসে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘বান্দা পূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে ঠাট্টা-মশকরায় মিথ্যা বলা এবং ঝগড়া-বিবাদ করা ছেড়ে দেয়, যদিও সে সত্যবাদী হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রসিকতা করতেন, তবে তাতে কোনো অসত্য থাকত না। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো আমাদের সঙ্গে কৌতুকও করে থাকেন। তিনি বললেন, আমি শুধু সত্য কথাই বলে থাকি (এমনকি কৌতুকেও)। (সুনানে তিরমিজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের একটি সুন্দর ঘটনা থেকে আমরা এর বাস্তব শিক্ষা পাই। একদা এক বয়োবৃদ্ধ নারী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে জান্নাতবাসী করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন মৃদু হেসে বললেন, কোনো বৃদ্ধ তো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এই কথা শুনে বৃদ্ধ নারীটি অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং কাদতে লাগলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়ে বললেন, তুমি বৃদ্ধা অবস্থায় জান্নাতে যাবে না। বরং মহান আল্লাহ জান্নাতের সব নারীকে যুবতী করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এখানে বৃদ্ধ নারীর সঙ্গে সামান্য কৌতুক করেছিলেন, কিন্তু তার কথার মধ্যে বিন্দুমাত্র মিথ্যার আশ্রয় ছিল না। কারণ জান্নাতিরা আসলেই চিরতরুণ হবেন।
হাসিমুখ ও সদালাপ মুমিনের সৌন্দর্য। তাই পরিচ্ছন্ন বিনোদন চর্চা ও সব ধরনের মিথ্যা বর্জন করাই হবে আমাদের কর্তব্য।
লেখক : ইসলামি গবেষক