মোদি-বাইডেন বৈঠকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক উষ্ণ ছিল বলে আখ্যায়িত করা হতো। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতের অবস্থানের পর থেকেই সম্পর্কের সমীকরণ পাল্টে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে শীতল এবং কোনো ক্ষেত্রে বৈরী সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। তবে গত দেড় মাসের তুলনায় সম্প্রতি ঢাকা-দিল্লি এ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়।

এর মধ্যে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের উইলমিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বাসভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির বরাতে গতকাল রবিবার ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই ও দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ভারতীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোট কোয়াডের এবারের সম্মেলনের আলোচনায় উঠেছে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও। শনিবার উইলমিংটনে কোয়াডের সম্মেলনে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার এ তথ্যও নিশ্চিত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মোদি-বাইডেন বৈঠকে অবশ্যই বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক ঘিরে একটি কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে তারা ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আবার বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্কের হাওয়া ইতিমধ্যে দেখা গেছে। এ মাসেই ঢাকা সফর করে গেছে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল। সেখানে আলোচিত কূটনীতিক ও যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দিল্লিও সফর করেছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, লুর সফরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কটি প্রাধান্য পেয়েছিল। আর মোদি-বাইডেন বৈঠকে অবশ্যই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শেখ হাসিনার বিষয়টিও সেখানে আলোচনা আসার কথা।

বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর আজকালের মধ্যে ড. ইউনূসের সঙ্গে বাইডেনের বৈঠক হওয়ার কথা। আবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বৈঠক হবে। তাতে মনে হয় ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটন পরামর্শ দেবে কিংবা দূতিয়ালিও করতে পারে।

তারা মনে করেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ । তবে ভারতের সঙ্গে নতজানু সম্পর্ক নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক যেমন রয়েছে তেমনি কোনো বিষয়ে অস্বস্তিকর বিষয়ও ঘটেছে। এখন যে শীতল সম্পর্কটা চলছে, তা কোনোভাবেই দীর্ঘদিন চলা উচিত নয়।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুসম্পর্কে বিষয়টি সবাই ওয়াকিবহাল। এদিকে শেখ হাসিনার পতন এবং নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির টানাপড়েন একবারেই দৃশ্যমান হয়েছে। গত মাসে দেশের কয়েকটি জেলায় বন্যা, পানির হিস্যা, সীমান্ত হত্যা এবং শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়াসহ দুই দেশের মধ্যে চলমান নানা ইস্যুতেই বিরোধিতার সুর দেখা গেছে। এটা দুই দেশের সরকারের দায়িত্বে থাকা উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ছাড়াও জনগণের মধ্যেই দেখা গেছে। বিরোধিতা এখনো চলমান। তবে এর মধ্যে নতুন সরকারের ভারতে ইলিশ রপ্তানি নিয়ে কঠোর অবস্থানের পর শনিবার ইলিশ রপ্তানির বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তও ইঙ্গিত দেয় দুপক্ষই টানাপড়েন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

এখন এ টানাপড়েনের অবসান চায় ঢাকা ও দিল্লি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হাসান গত শনিবার সাংবাদিকদের স্পষ্টই বলেছেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শঙ্কর সুব্রিনিয়ামের সঙ্গে তার বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে যে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে, এটা স্বীকার করতে হবে। সমস্যার সমাধান করতে হলে, সমস্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করলে চলবে না। আমরা অবশ্যই টানাপড়েন পেছনে ফেলতে চেষ্টা করব এবং ওয়ার্কিং রিলেশন যেন হয়। তবে সম্পর্কটা হতে হবে সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে। এর ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং আমরা সেই চেষ্টা করব।

মোদি-বাইডেন সম্পর্ক নিয়ে নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফরে অনুষ্ঠিত কোয়াড সম্মেলনের আলোচনার একটি মূল বিষয় ছিল ভারতের প্রতিবেশী বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও। বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিষয়ে সেখানে মতামত বিনিময় হয়েছে। তবে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত প্রেস ব্রিফিংয়ে মোদির সঙ্গে বাইডেনের ফোনালাপে বাংলাদেশের বিষয়ে কোনো তথ্যই উল্লেখ করা হয়নি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। আবার ভারত কোয়াডে যুক্ত হয়েছে। এটা নতুন মেরূকরণ। বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ভারতের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। গত কয়েক বছর ধরে এর ব্যত্যয় দেখা গেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখন দুপক্ষই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুর পাশাপাশি সম্পর্ক স্বাভাবিক চায়। আর মোদি-বাইডেন বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হওয়া খুব স্বাভাবিক। কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার প্রতিফলন অবশ্যই দেখা যাবে। এটা ইতিবাচকই হবে আশা করছি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ সম্পর্কটা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থরক্ষা করে স্বাভাবিক হওয়া উচিত। আগেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক লাভ অ্যান্ড হেইট্রেডের মধ্যে চলে আসছিল। তাই নতজানু সম্পর্ক করলে দুই দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠবে না। তিনি মনে করেন, মোদি-বাইডেন বৈঠকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাবে।

এদিকে এখনো ঢাকা-দিল্লির সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধিতাপূর্ণ অবস্থান বিদ্যমান। অনেক দেন-দরবারের পর গত শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে তিন হাজার টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেয়। এর আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ভারতে ইলিশ রপ্তানি না করার বিষয়ে কঠোর অবস্থান জানান। গতকাল রবিবারও তিনি বলেন, ভারতে ইলিশ রপ্তাানির যে অনুমতি হয়েছে, সেটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। এখনো ইলিশ যায়নি, মাত্র সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য বাজারে ইলিশের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।

আবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হুমকি দিয়েছেন, ভারতের ঝাড়খ- রাজ্যে বিজেপি সরকার গড়তে পারলে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করা হবে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে গত শুক্রবার ঝাড়খ-ের সাহেবগঞ্জ জেলায় ‘পরিবর্তন যাত্রা’র উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে দেওয়া ভাষণে অমিত শাহ এ হুমকি দেন।

আবার গতকাল এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সময়টা শেষ হয়ে গেছে, সরকারি পর্যায়ে যদি কোনো নীরবতা থেকে থাকত, নিষ্ক্রিয়তা থেকে থাকত, সে দিনটা শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নদীর পানি শুধু রাজনীতি নয়, এটা কূটনীতি ও অর্থনীতিও। জনগণের চশমা দিয়ে সমস্যা দেখতে এসেছি। জনগণের কাছে জানতে এসেছি তারা কী সমাধান চান। স্থানীয় জনসাধারণ বলেছেন, প্রতিবেশী দেশ বাঁধ কেটে দেওয়ায় তারা বন্যায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।