বামপন্থিদের উত্থানে নতুন স্বপ্ন লঙ্কানদের

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থি নেতা অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। গতকাল রবিবার দ্বিতীয় দফা ভোট গণনার পর চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে দেশটির নির্বাচন কমিশন। সেখানেও বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসার থেকে এগিয়ে থাকায় আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দিশানায়েকেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে প্রথমবার কোনো বামপন্থি নেতা দেশটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেল। দেশটিতে বামপন্থিদের জন্য এটি একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

২০২২ সালে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। তখন ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর প্রথমবারের মতো দেশটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এবারের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন ১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি ভোটার। শ্রীলঙ্কার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন ৩৯ জন। তবে মূল লড়াই হয়েছে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের নেতা অনুড়া কুমারা দিশানায়েকে, বিরোধী দল সঙ্গী জন বালাওয়াগারের প্রার্থী সাজিথ প্রেমাদাসা এবং বিদায়ী প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের মধ্যে। তবে প্রথম দফা ভোট গণনায় প্রার্থীই ৫০ শতাংশ ভোট বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় বিজয়ী নির্ধারণে দ্বিতীয় দফায় ভোট গণনার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।

প্রথম দফার ভোট গণনায় এগিয়ে ছিলেন মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ দিশানায়েকে। তিনি পেয়েছিলেন ৪২ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট। ৩২ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা। আর ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে। তবে জয়ের সম্ভাবনা না থাকায় দ্বিতীয় দফায় ভোট গণনা থেকে বাদ পড়েন বিক্রমাসিংহেসহ বাকিরা। শ্রীলঙ্কার নির্বাচন ব্যবস্থায় ব্যালট পেপারে ভোটারদের জন্য তাদের পছন্দ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তিনজন প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকে। এই বাদ যাওয়া প্রার্থীদের ব্যালটই খতিয়ে দেখে বিজয়ী নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮২ সালের পর থেকে শ্রীলঙ্কার আটটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিটিতেই প্রথম দফাতেই বিজয়ী নির্ধারিত হয়েছে। এবারই প্রথম দ্বিতীয় দফায় গড়াল নির্বাচনের ভোট গণনা।

আজ সোমবার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে অনুড়া কুমারা দিসানায়েকের। তার দল জনতা বিমুক্তি পেরেমুনা ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার জোটের অন্যতম বড় শরিক। এই জোটের প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দিশানায়েকের উত্থানের গল্প রূপকথার মতন। ১৯৬৮ সালে জন্ম নেওয়া দিশানায়েক ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শ্রীলঙ্কার দুর্নীতি ও দুর্বল শাসনের কঠোর সমালোচক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ২০০০ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত তিনি কৃষি, প্রাণিসম্পদ, ভূমি ও সেচমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী হুইপ হিসেবে কাজ করেন। ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৭তম জাতীয় কনভেনশনে তিনি জেভিপির নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা তাকে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। দেশটির নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে দেশটির গণবিক্ষোভ পর দিসানায়েকের সংস্কারবাদী দর্শনের কারণেই ইতিহাস গড়তে পেরেছেন তিনি।

চরম অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে কাক্সিক্ষত পরিবর্তনের জন্য দাবি জানানো ভোটারদের মধ্যে তার দুর্নীতিবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।