চকরিয়ায় ডাকাতের ছুরিকাঘাতে সেনা কর্মকর্তা নিহত

কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি প্রতিরোধ করতে গিয়ে ডাকাতের ছুরিকাঘাতে সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) নিহত হয়েছেন। সোমবার রাত সাড়ে ৩টায় উপজেলার ডুলাহাজরা ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার দুই দফায় ছয়জনকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নিহত সেনা কর্মকর্তাকে টাঙ্গাইলে তার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। তানজিম সারোয়ারের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

নিহত লেফটেন্যান্ট তানজিম টাঙ্গাইল জেলার বিন্দুবাসিনী গ্রামের ছেলে। তিনি পাবনা ক্যাডেট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সমাপনান্তে ৮২তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সঙ্গে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি থেকে ২০২২ সালের ৮ জুন আর্মি সার্ভিস কোরে (এএসসি) কমিশন লাভ করেন।

আটকরা হলেন মাইজপাড়া গ্রামে ডাকাত দলের পাহারাদার হিসেবে পরিচিত জিয়াবুল হক ও তার ভাগ্নিজামাই দিনমজুর মোহাম্মদ হোসেন এবং ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য বেলাল। এ ছাড়া অন্য তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জিম্মায় নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসীর ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুলিশের ডুলাহাজরার পূর্ব মাইজপাড়ার রেজাউল করিমের বাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে খবর পেয়ে সেনাদল অভিযানে যায়। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাতরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ওই সময় কয়েকজন ডাকাতের পিছু ধাওয়া করেন লেফটেন্যান্ট তানজিম। তখন ডাকাতদের সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সেনা কর্মকর্তা তানজিমের গলায় ছুরিকাঘাত করে ডাকাতরা। পরে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে প্রথমে মালুমঘাট খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে, পরে সেখান থেকে তাকে রামুর সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকাবাসী জানায়, ডাকাতের হামলার শিকার হওয়া রেজাউলের প্রতিবেশী জিয়াবুল। মূলত জিয়াবুল গ্রামবাসীর তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অবস্থান সম্পর্কে ডাকাত দলকে অবহিত করে। গতকাল ভোরে ডাকাতিতে ইনফরমার হিসেবে কাজ করেছে জিয়াবুল। আর তার ভাগ্নিজামাই মোহাম্মদ হোসেন পেশায় দিনমজুর। এ ছাড়া অন্য আটক বেলাল সশস্ত্র ডাকাত দলের সদস্য।

চকরিয়া থানার ওসি মো. মনজুর কাদের ভূঁইয়া বলেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে হেলিকপ্টারযোগে টাঙ্গাইলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

গতকাল দুপুর ২টায় আইএসপিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গোয়েন্দা সূত্রে ডাকাতির খবর পেয়ে চকরিয়া সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে রাত ৩টায় অভিযান পরিচালনা করার সময় সাত-আট সদস্যের ডাকাত দল সেনা টহল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার সময় লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (২৩) ডাকাত দলের কয়েকজনকে তাড়া করেন। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করলে গুরুতর আহত হন এবং এতে তার প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তাৎক্ষণিকভাবে লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনকে উদ্ধার করে মালুমঘাট মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কর্তৃক মৃত ঘোষণা করা হয়।

তরুণ এই সেনা কর্মকর্তার আত্মত্যাগ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।

উল্লেখ্য, ঘটনাস্থল থেকে তিনজন ডাকাতকে আটকসহ একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক, ছয় রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ডাকাত সন্দেহে আরও তিনজনকে আটক করা হয়।

এদিন বিকেলে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও সেনাবাহিনীর একটি বিভাগীয় টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা বাকরুদ্ধ, মা যাচ্ছেন মূর্ছা : কক্সবাজারের চকরিয়ায় যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনা করার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনা অফিসার লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জনের বাসায় চলছে শোকের মাতম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাবা বাকরুদ্ধ, মূর্ছা যাচ্ছেন মা। এ ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহত সেনা অফিসার তানজিমই বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তা বড় এক বোন রয়েছে। তার নাম তাসনুবা সারোয়ার সূচি। তিনি ঢাকায় স্বামীসহ অবস্থান করেন।

একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নিহত তানজিমের বাবা সারোয়ার জাহান দেলুয়ার বলেন, ‘এরকম মৃত্যু যেন আর কারও না হয়। আর যেন কোনো বাবার এভাবে আর্তনাদ করতে না হয়। আমি আমার ছেলে হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার চাই। তানজিমই আমার একমাত্র ছেলে। সেই ছিল বাড়ির একমাত্র উপার্জন করার লোক। তাই আমি আজ অসহায়। আমি এ হত্যাকা-ের দ্রুত বিচার ও ফাঁসি চাই।’

এদিকে একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে নিহত তানজিমের মা নাজমা সারোয়ার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারপ্রধান ও সেনাপ্রধানের কাছে আমি ছেলে হত্যার বিচার চাই। যারা তার সঙ্গে ছিল তারা কেন আমার ছেলেকে রক্ষা করতে পারল না। তাদেরও বিচার চাই আমি। তানজিম ছিল আমার কলিজার টুকরা।’

তানজিম নিহতের খবর এলাকায় জানাজানি হলে তার বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজনসহ এলাকাবাসী। ইতিমধ্যেই ঘাটাইল শহীদ সালাহউদ্দিন সেনানিবাস থেকে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা নিহত তানজিমের পরিবারের সঙ্গে তার দাফন সম্পূর্ণ করেন।

তানজিমের বড় বোন সূচি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ সোমবার রাতে কথা হয়েছিল। আমার ভাই আমাকে মিশনের যাওয়ার কথা বলেছিল। ও আমাকে বলেছিল একটি মিশনে যাচ্ছি, আমার জন্য দোয়া করো। যদি কিছু হয়ে যায়। আমির তোমার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় থাকব। ও মিশনে যাওয়ার আগে আমাদের জানিয়ে যায়। সকালে ও আর ফোন দেয়নি। সে আমার কাছে পিঠা খেতে চেয়েছিল। অক্টোবরের ১ তারিখে তানজিমের জন্মদিন পরিবারের সঙ্গে পালন করার কথা ছিল। ওইদিন আমার ভাই আমার কাছে টিয়াপাখি উপহার চেয়েছিল। আমি কাকে টিয়াপাখি উপহার দেব।’

নিহত তানজিমের মরদেহ টাঙ্গাইলে তার গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার করটিয়া ইউনিয়নের করের বেতকা এলাকায় আসে বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে। পরে তার মরদেহ বাদ আসর বোয়ালী জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে বোয়ালী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় জামায়াতের উদ্বেগ : কক্সবাজারের ডুলাহাজরা এলাকায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে দলটি। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।

বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘গত সোমবার রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজরা এলাকায় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নির্জন (৩৯ এসটি ব্যাটালিয়ন) নিহত হয়েছেন। আমি এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তা তানজিম সারোয়ারের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তার পরিবার-পরিজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।’