বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, নির্বাচন যাতে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে হতে পারে সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন করতে তার বাহিনী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে। তার ভাষ্য, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, তিনি ড. ইউনূসের পাশে থাকবেন; যাতে করে প্রধান উপদেষ্টা তার কর্মসূচি সম্পন্ন করতে পারেন।
গত সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকার দেন সেনাপ্রধান। ওই সাক্ষাৎকারে সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার একটি রূপরেখাও দেন তিনি। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সশস্ত্র বাহিনীকে প্রেসিডেন্টের অধীনে নেওয়ার ধারণা উঠে এসেছে তার সাক্ষাৎকারে। ঢাকায় সেনাপ্রধানের কার্যালয়ে নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গতকাল মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের বিদায়ের পর সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন ড. ইউনূস। তারপর থেকে অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দাবি করে আসছে। তবে সরকারের দিক থেকে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, পুলিশসহ ছয়টি বিষয়ে সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। এসব কমিশন ১ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করে পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার কথা।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেনাবাহিনী প্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই হওয়া উচিত। তবে তিনি ধৈর্য ধারণের ওপরও জোর দেন। তিনি বলেন, আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন তাহলে সেটাই একটা টাইম ফ্রেম (সময়সীমা) হওয়া উচিত, যার মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারি।
সেনাপ্রধান জানান, প্রধান উপদেষ্টা এবং তিনি প্রতি সপ্তাহে সাক্ষাৎ করছেন এবং তাদের মধ্যে ‘অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক’ বিদ্যমান। দেশকে স্থিতিশীল করতে সরকারের প্রচেষ্টায় সামরিক বাহিনী সমর্থন দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমি নিশ্চিত আমরা একযোগে কাজ করলে ব্যর্থ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে গত জুলাই মাসে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। একপর্যায়ে তা সরকারবিরোধী অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এ আন্দোলনে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকা ঢাকার সড়কগুলোতে শান্তি ফিরেছে। কিন্তু হাসিনা সরকারের নাটকীয় পতনের পর প্রশাসনের কিছু অংশ এখনো সঠিকভাবে কার্যকর হয়নি। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্যের পুলিশ বাহিনী এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে এগিয়ে এসেছে।
একটি রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশ সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়। ১৯৯০ সালে সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ সালে সামরিক বাহিনী আবার অভ্যুত্থান ঘটায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন জানায়। এ সরকার দুই বছর দেশ চালায়। পরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন।
ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, তার নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি বলেন, আমি এমন কিছু করব না, যা আমার বাহিনীর জন্য ক্ষতিকর হয়। আমি পেশাদার সৈনিক। আমি আর্মিকে পেশাদার রাখতে চাই।
তিনি জানান, ক্ষমতা থেকে হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর সরকার যে সংস্কারের কথা বলছে তার আলোকে সেনাবাহিনীতেও কেউ কোনো অনিয়ম করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং এর মধ্যে কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু সামরিক কর্মকর্তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় কাজ করার সময় কর্মপরিধির বাইরে গিয়ে কিছু করে থাকতে পারেন। যদি কোনো কর্মরত সেনাসদস্য দোষী সাব্যস্ত হন, আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সেনাবাহিনীকে দূরে রাখা প্রসঙ্গে সেনাপ্রধান বলেন, এটা শুধু তখনই ঘটতে পারে, যখন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার কিছুটা ভারসাম্য থাকে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি রাষ্ট্রপতির অধীনে রাখা যেতে পারে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। এ মন্ত্রণালয় সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। সেনাপ্রধান যে ব্যবস্থার কথা বলছেন, তা করতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, সামগ্রিকভাবে সামরিক বাহিনীকে কখনই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা উচিত নয়। একজন সৈনিকের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া উচিত নয়।