দেশের প্রথম সারির শিল্প গ্রুপের একটি গাজী গ্রুপ। যার কর্ণধার সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। কাগজপত্রে তার মোট সম্পদ ১ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার। এতসব সম্পদ থাকার পরও তার নজর পড়ে সরকারি জমির ওপর। দেনদরবারের একপর্যায়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে তার নামে উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পে ১৫ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এ আকৃতির প্লটে মন ভরেনি, চাই ৪০ কাঠা আয়তনের প্লট। উপায়ান্তর না পেয়ে মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী শেষমেশ তাকে পূর্বাচল প্রকল্পে ৪০ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। সংস্থাটির নথিপত্র ঘেঁটে এসব তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছর ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থীদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে শতাধিক এমপি প্রার্থীর অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকা ১৮ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে টিআইবি। যে তালিকার শীর্ষে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের প্রার্থী সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৩৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আর স্থাবর সম্পদ আছে ১০৭ কোটি ৩১ লাখ টাকার। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট সম্পদ ১ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার। এতসব সম্পদ থাকার পরও তিনি সরকারের কাছে জমি চেয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। মন্ত্রণালয় থেকে গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রতিষ্ঠানের নামে প্লট বরাদ্দ দিতে রাজউক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজউকের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ১ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়া হয় গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রতিষ্ঠানের নামে। যার আয়তন ১৫ কাঠা। তবে এটি মনমতো না হওয়ায় (আয়তনে ছোট) ২০২০ সালে উত্তরার প্লটের পরিবর্তে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৪০ কাঠা বা তার কমবেশি আয়তনের একটি প্লট দিতে আবেদন করেন। তৎকালীন বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ডিও লেটার (আধা সরকারিপত্র) দিয়ে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর কাছে এ আবেদন করেন। আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রাজউকের ২০২০ সালের সপ্তম বোর্ডসভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পে বিশেষায়িত কোটায় বরাদ্দ দেওয়া প্লটের পরিবর্তে পূর্বাচল প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ প্রদানের অনুশাসন পেতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া পূর্বাচল প্রকল্পের লে-আউটের পঞ্চম সংশোধনীর ওপর মামলা চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ প্রদানে অ্যাটর্নি জেনারেলে মতামতও নেওয়া হবে। এসব সিদ্ধান্তের পর বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ফের গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তার উত্তরার প্লট সমার্পণ করে পূর্বাচল প্রকল্পের প্লটের আবেদনসংক্রান্ত সেই পত্রের বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রম গ্রহণপূবর্ক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে ২০২২ সালের ৭ মার্চ চিঠি দেওয়া হয়। এরপর ওই চিঠির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রাজউকের ২০২২ সালের পঞ্চম বোর্ডসভায় উপস্থাপন করে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রতিষ্ঠানের নামে উত্তরায় বরাদ্দ দেওয়া প্লট বাতিল করে পূর্বাচল প্রকল্পে ৪০ কাঠা আয়তনের প্লট বরাদ্দ। পরে ২০২৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২/২০২৩তম বোর্ডসভায় পূর্বাচল ৯ নম্বর সেক্টরের ২১৬ নম্বর রোডের ১ নম্বর প্লটটি বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ওই প্লটটি ৯১ কাঠা হওয়ায় প্রকল্পের লে-আউট নকশার পঞ্চম সংশোধনীতে ৪০ কাঠা করা হয়। অবশিষ্ট অংশ খেলার মাঠ হিসেবে রাখা হয়। প্রকল্পের লে-আউট নকশার পঞ্চম সংশোধনীর ওপর আদালতে নিষেধাজ্ঞা নিষ্পত্তির পর প্লটটি গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী ও তার স্ত্রীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ২৫ আগস্ট তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর সিদ্ধান্ত হয়।
দুদকের কাছে থাকা অভিযোগে বলা হয়, গোলাম দস্তগীর পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎপূর্বক বিদেশে অর্থ পাচার করে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। দুদকের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গোলাম দস্তগীর গাজী ও তার স্ত্রী তারাবো পৌরসভার সাবেক মেয়র হাসিনা গাজীর বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিশনের মহাপরিচালককে (বিশেষ তদন্ত) দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের হলফনামা অনুযায়ী গোলাম দস্তগীরের বছরে আয় ছিল ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৮৩ কোটি ২৯ লাখ ২৫ হাজারে। ওই সময়ে তার নগদ ৯৪ লাখ ১২ হাজার টাকা, ১৬ লাখ ৭ হাজার টাকা ব্যাংক জমা, সাড়ে ৪ কোটি টাকার কোম্পানি শেয়ার, ৩৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার যানবাহনসহ মোট ৪৫ কোটি ৯৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার অস্থাবর এবং ১১ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার স্থাবরসহ ৫৭ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকার সম্পদ ছিল। ১৫ বছর পর ২০২৩ সাল পর্যন্ত তার নগদ ৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ৬১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে জমা, ২২ কোটি ৫ লাখ টাকার শেয়ার, ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকার যানবাহনসহ অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ হাজার ৩৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অকৃষি জমি ও ভবন বাবদ স্থাবর সম্পদ আছে ১০৭ কোটি ৩১ লাখ টাকার। তার স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। ১৫ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ২৫-গুণ বেশি।