রাজধানীর গুলশানের একটি খালি প্লটে ছিল রফিকুল ইসলামের চায়ের দোকান। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় খালি প্লটে দোকান হওয়ায় স্বাচ্ছন্দ্যে সবাই ভেতরে ঢুকে চা-সিগারেট খেতেন। সকাল-সন্ধ্যা ভিড় জমে থাকা চায়ের দোকান সামাল দিতে দুজন কর্মচারীও নিয়োগ দেন রফিকুল। তাদের মধ্যে এক কর্মচারীসহ রফিকুলকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। বাকি এক কর্মচারীর খোঁজ মিলছে না, যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কিছুদিন আগেই। আশপাশের ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে পলাতক ওই কর্মচারীকে দোকানের মালামালসহ শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় প্লটটি থেকে বের হয়ে ভ্যানে করে চলে যেতে দেখা গেছে। যে কারণে গুলশানের এই জোড়া খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের তীর ওই দোকান কর্মচারীর দিকে।
খালি ওই প্লটের মালিকানায় রয়েছেন চারজন। দীর্ঘদিনের চেষ্টাতেও সেখানে ভবন নির্মাণ করতে পারেননি মালিকরা।
কারণ রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) নিয়ম অনুযায়ী, ভবন নির্মাণ করতে হলে মালিকানায় থাকতে হবে একক কাউকে।
গত শনিবার গুলশান ২ নম্বরের ১০৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর প্লট থেকে রফিকুল ইসলাম ও তার দোকানের কর্মচারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
গুলশানের এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। সেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আমিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গুলশানের ওই প্লটটি দেখাশোনার পাশাপাশি চায়ের দোকান চালাতেন নিহত রফিকুল। সেই দোকানের কর্মচারী সাব্বির। তবে কিছুদিন আগে ওই দোকানে নতুন করে আরেক ছেলেকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর থেকে নতুন নিয়োগ পাওয়া ওই কর্মচারী পলাতক রয়েছেন। তাই ধারণা করা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই কর্মচারীর যোগসাজশ থাকতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পলাতক কর্মচারীর পরিচয় জানা যায়নি। তাকে আটক করতে পারলেই এই জোড়া হত্যার রহস্য উদঘাটন করা যাবে।’ গতকাল রবিবার সরেজমিনে দেখা যায়, খালি ওই প্লটটির ফটকে ঝুলছে তালা। আগের মতো ভেতরে চা-সিগারেটের আড্ডা নেই। খালি প্লটটির সামনেও ছিলেন না কেউ। জোড়া খুনের বিষয়ে আশপাশের ভবনগুলোর কেউ কথা বলতেও রাজি না। সেখানে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে আসা এক নারী বলেন, ‘এই চায়ের দোকানে এলে সব সময় রুটি ও চা খাওয়াতেন (নিহত রফিকুল)। কিন্তু আজ সেই লোকটা নেই। এখন আমারে খাওয়ানোর লোকও নেই।’
প্লটটির বিপরীতে রাস্তার ওপাশে ‘বই বিচিত্রা’ নামে বইয়ের একটি দোকান রয়েছে। দোকানটির কর্মীদের সঙ্গে জোড়া খুনের বিষয়ে কথা বলতে গেলে এ বিষয়ে কেউ কোনো কিছু জানেন না বলে জানান। তার পাশেই ‘গ্রোসারি শপ’ নামে একটি দোকানের মালিক বায়েজীদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্লটটি দীর্ঘদিন খালি পড়ে আছে। ওই প্লটটি দেখাশোনার পাশাপাশি চায়ের দোকান দেন রফিকুল। অনেক ভালো মানুষ ছিলেন তিনি। ২৫-৩০ বছর এই এলাকায় তিনি। সেই সুবাদে সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল তার। কিন্তু কী কারণে এমনভাবে খুন হলেন, তা বুঝতে পারছি না।’
ওই প্লটের পাশের ভবনের (২২ নম্বর প্লট) নিরাপত্তাকর্মী লিটন হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আমার ডিউটি ছিল। ওইদিন রাত সাড়ে ১০টায় রুটি ও কলা কিনে দোকানে বসেই খাই। আমরা জানি শুক্রবার দুপুর ২টার পর দোকান খোলেন রফিক চাচা। তিনি এই এলাকায় রফিক চাচা নামেই পরিচিত। কিন্তু তিনি (রফিকুল) শুক্রবার দোকান খোলেননি। শুক্রবার সন্ধ্যার পরও দোকান না খোলায় আশপাশের মানুষ তার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। আমিও তার মোবাইল ফোনে কল দিয়েছিলাম। কিন্তু বন্ধ পাই রফিক চাচার মোবাইল।’
পরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় নিহত রফিকুলের গ্রামের বাড়িতে খবর দিলে শনিবার সকালে তার ছেলে আসে জানিয়ে লিটন হোসেন বলেন, ‘পরে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, রফিক চাচা ও তার দোকানের কর্মচারী সাব্বিরকে (১৫) গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে।’
ওই দোকানের নতুন কর্মচারীর বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, ‘সাব্বির প্রায় ছয় মাস ধরে এখানে আছে। কিন্তু নতুন একজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে, তাকে তেমন চিনি না। তার নাম-পরিচয়ও জানি না। তবে তার মুখে দাড়ি রয়েছে। খাটো ও কালো করে ছেলেটা। বয়স ২০-২৫ হবে।’
ওই প্লটের আশপাশের ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে প্লটটি থেকে নতুন ওই কর্মচারী বের হয়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে চায়ের দোকানের মালামালও ছিল।
রাজউক থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর প্লটটির মালিক চারজন। তারা হলেন মরিয়ম বেগম এবং তার তিন ছেলে মর্তুজা রেজা, মনজুর মোর্শেদ ও মোস্তাক আহম্মেদ। দীর্ঘদিন ধরে এই প্লটটি খালি পড়ে আছে। সেখানে ভবন তৈরি করতে গেলে একক মালিকানার অধীনে প্লটটি থাকতে হবে। কিন্তু সেই একক মালিকানা কেউ পাচ্ছেন না, তাই ভবনও তৈরি করতে পারছেন না চার মালিক।
নিহত রফিকুলের চাচাতো ভাই হুমায়ন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালি প্লটটি বিএনপির এক নেতার। আওয়ামী লীগের সময় তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা থাকায় দেশে আসতে পারছিলেন না। প্লটের মালিকদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হতো। কিন্তু কী কারণে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড, তা বুঝতে পারছি না। আমরা হত্যা মামলা করেছি। নতুন কর্মচারী কাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কিছু জানি না।’
এই জোড়া খুনের বিষয়ে গুলশান থানার ওসি তৌহিদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রফিকুলের ছেলে মো. বাপ্পী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। এই হত্যার ঘটনায় পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে ও রহস্য উদঘাটনে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একজনকে সন্দেহ করা হচ্ছে, যে ওই দোকানে কর্মচারী হিসেবে নতুন যোগ দিয়েছিলেন। তিনি কার মাধ্যমে যোগ দিয়েছিলেন, তাকেও শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।’