রাজধানীর পান্থপথের স্বপ্ন সুপারশপে কাঁচা বাজার করেছেন মো. শাহাদৎ হোসেন। তিনি কয়েক রকমের সবজি কিনেছেন। তার ক্রয় করা প্রত্যেকটি সবজি ওই সুপারশপের বিক্রয়কর্মী আবু হোসাইন কাগজের ঠোঙায় দিয়েছেন। বাজার শেষ করার পর বিল করার সময় ক্রেতা শাহাদৎ হোসেন পলিথিন ব্যাগে সবজিগুলো দিতে বলেন। তখন ক্যাশ কাউন্টার থেকে তাকে জানানো হয় আজ থেকে সুপারশপে পলিথিন নিষিদ্ধ। তাই পলিথিন আমরা ব্যবহার করছি না। আপনি আমাদের কাছ থেকে স্বল্প মূল্যে পাটের ব্যাগ নিতে পারেন। পরে তিনি স্বপ্ন সুপার শপের নিজের তৈরি ৮ টাকার কাপড় ও পাটের ব্যাগে বাজারগুলো নিয়েছেন।
এসময় দুপুর ৩টার দিকে তার সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। আজ মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) থেকে সুপার শপে পলিথিন রাখা নিষিদ্ধ এমনকি ক্রেতাদের দেওয়া যাবে না বিষয়টি সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল, কিন্তু অফিস থেকে ফেরার পথে স্বপ্ন’তে বাজার করতে ঢুকেছি। তাই বাড়ি থেকে ব্যাগ নিয়ে আসা হয়নি। পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আনন্দের। এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে পরিবেশের উন্নতিসাধনসহ রাজধানীজুড়ে নানা সমস্যার সমাধান হবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আমাদের (ক্রেতা ও বিক্রেতা) উভয়কেই সচেতন হতে হবে। নয়তো এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হবে বলেও জানান তিনি।’
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পান্থপথের স্বপ্ন সুপারশপে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্রেতাই ব্যাগ ছাড়াই বাজার করতে আসেন। শপটির বিক্রয়কর্মীরা ক্রেতাদের পছন্দকৃত বাজারগুলি কাগজের ঠোঙায় দিয়ে দিচ্ছেন। আর বিল করার সময় ক্রেতাদের ব্যাগ নিয়ে আসছেন কিনা তা জিজ্ঞেস করা হচ্ছে। ব্যাগ সঙ্গে করে না নিয়ে আসলে স্বপ্ন’র নিজের তৈরিকৃত ব্যাগ নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। সুপার শপটিতে পাটের ও কাপড়ের ব্যাগ রাখা হয়েছে। সেখানে শুধু পাটের ব্যাগ ১১ টাকা, পাট ও সুতার ব্যাগ ছোট ১১টাকা, পাট ও সুতার ব্যাগ একটু বড় ১২ টাকা, পাট ও সুতার ব্যাগ ১৪ টাকা, কাপড় ও পাটের ব্যাগ ৬ টাকা, কাপড় ও পাটের ব্যাগ ৮ টাকা এবং কাপড় ও পাটের ব্যাগ ১১ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতারা বাজার করার পর প্রয়োজন মত ব্যাগ সেখান থেকে কিনছেন। এসময় পলিথিন বন্ধের বিষয়টি সবাই ভালো উদ্যোগ বলে জানিয়েছেন। তবে দু’একজন আগে থেকেই অবহিত না থাকায় কিছুটা অস্বস্থিতে পড়তে দেখা গেছে।
ওই সুপারশপের বিক্রয়কর্মী আবু হোসাইনের কাছে পলিথিন নিষিদ্ধের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমদিন হওয়ায় অনেকেই ব্যাগ নিয়ে আসতে ভুলে গেছেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে পলিথিনে বাজার নিয়েই মানুষ অভ্যস্ত। আমরা পলিথিন বদলে কাগজের ঠোঙা ব্যবহার করছি। এছাড়াও আমাদের নিজস্ব পাটের ও কাগজের ব্যাগের বিষয়ে তাদের অবহিত করছি। পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ায় আমরা খুশি। আগে প্রত্যেকটি বাজারের বিপরীতে একটি করে পলিথিন দিতে হত। এখন এই জটিলতা নেই। এছাড়াও পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ায় ফলে পরিবেশ ভালো থাকবে।’
তবে অনেক ক্রেতার অভিযোগ, আগে সুপারশপগুলোতে পলিথিন বিনামূল্যে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন প্রত্যেকটি ব্যাগের জন্য আলাদা চার্য রাখা হচ্ছে। সুপারগুলোর উচিত ব্যাগগুলো বিনামূল্যে রাখা। এতে ক্রেতাদের উৎসাহী হতেন।
এদিকে রাজধানীর মিরপুর-১৪ প্রিন্স বাজার সুপার শপের নিয়মিত ক্রেতা আনিসুর রহমান। আজ থেকে পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি তাকে অবহিত করতে প্রিন্স বাজার মোবাইলে তাকে মেসেজ করেছেন। মেসেজে বলা হয়েছে, ‘সন্মানিত ক্রেতা, সরকারী নির্দেশনায় আজ থেকে পলিথিন/প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ । বাজার করার জন্য পাটের ও কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে রাখুন অথবা প্রিন্স বাজার থেকে ব্যাগ ক্রয় করে বাজার করুন।’
জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আজ ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে কোনো ধরনের পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ রাখা যাবে না এবং ক্রেতাদের দেওয়া যাবে না। বিকল্প হিসেবে সব সুপারশপে বা শপের সামনে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ক্রেতাদের জন্য রাখা হবে। আর ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ১০টি কাঁচাবাজারে পলিথিন বন্ধে কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়াও ১ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী পলিথিন উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে।’
এদিকে আজ সুপারশপে পলিথিন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং এসপিদের পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছেন উপদেষ্টা। গত রবিবার তিনি এ নির্দেশনা দিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এসময় উপদেষ্টা পলিথিনের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলেন, ‘প্লাস্টিক পলিথিনের অপ্রতিরোধ্য ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে, নদী-নালা ও জলাশয় দূষিত করছে এবং জীববৈচির্ত্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে প্লাস্টিক পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বন্ধে সব পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মাঈশা সুপার শপের সত্বাধিকারী আলমের কাছে সুপারশপে পলিথিন রাখা যাবে না বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্তে খুশি। পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হলে আমাদের ঝামেলা কমে যাবে। এখন ক্রেতারা বাজারের সময় ব্যাগ নিয়ে আসেন না। এতে প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য আমাদের আলাদা পলিথিন ব্যবহার করতে হয়। এতে আমাদের খরচ বাড়ে। তাই অন্তর্বতীকালীন সরকারের পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। প্রথম দিন হওয়ায় ক্রেতারা ব্যাগ আনতে ভুলে যাচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে ক্রেতারা বিষয়টি সঙ্গে মানিয়ে নিবেন বলে প্রত্যাশা তার।