পলিথিন বন্ধের পক্ষে একমত, কিন্তু বিকল্প কী?

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০২:৫২ পিএম

‘আমরা পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্তে খুশি। পলিথিনের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হলে আমাদের ঝামেলা কমে যাবে। এখন ক্রেতারা বাজারের সময় ব্যাগ নিয়ে আসেন না। এতে প্রত্যেকটি জিনিসের জন্য আমাদের আলাদা পলিথিন ব্যবহার করতে হয়। এতে আমাদের খরচ বাড়ে। তাই অন্তর্বতীকালীন সরকারের পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এর বিকল্প কী? 

সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মাঈশা সুপার শপের সত্বাধিকারী আলমের কাছে আগামীকাল থেকে সুপারশপে পলিথিন রাখা যাবে না বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি বিষয়টি জানার পর থেকে নতুন করে পলিথিন ক্রয় করিনি। আগের যা ছিল তা দিয়েই চলছে। আগামীকাল থেকে ক্রেতাদের সঙ্গে করে ব্যাগ নিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি তিনিও দোকানো ব্যাগ না রাখার কথা জানিয়েছেন।

সুপারশপের মালিকের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে ওই সুপারশপে বাজার করছিলেন মো. মারুফ। একসঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় একাধিক বাজার করেছেন। সুপারশপের কর্মচারী প্রত্যেকটি বাজারের বিনিময়ে একটি করে পলিথিন ব্যবহার করেছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে সুপারশপে পলিথিন নিষিদ্ধ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু এর বাস্তবায়ন কতটা টেকসই হবে সেই বিষয়টি দেখার বিষয়। কারণ পলিথিন নিষিদ্ধ করে আইন হয়েছে ২০০২ সালে। কিন্তু সেই আইন আলোর মুখ দেখেনি। তাই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হোক এটাই প্রত্যাশা আমাদের।’

জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে কোনো ধরনের পলিথিন বা পলিপ্রপিলিনের ব্যাগ রাখা যাবে না এবং ক্রেতাদের দেওয়া যাবে না। বিকল্প হিসেবে সব সুপারশপে বা শপের সামনে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ক্রেতাদের জন্য রাখা হবে। আর ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ১০টি কাঁচাবাজারে পলিথিন বন্ধে কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়াও ১ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী পলিথিন উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে।’

এদিকে আগামীকাল সুপারশপে পলিথিন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশের ডিআইজি, পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং এসপিদের পলিথিন ও পলিপ্রোপাইলিন ব্যাগ বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছেন উপদেষ্টা। গতকাল তিনি এ নির্দেশনা দিয়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। 

এসময় উপদেষ্টা পলিথিনের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে বলেন, ‘প্লাস্টিক পলিথিনের অপ্রতিরোধ্য ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে, নদী-নালা ও জলাশয় দূষিত করছে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে প্লাস্টিক পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বন্ধে সব পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’

গত ১ নভেম্বর কাঁচাবাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে পলিথিন। বিষয়টি সম্পর্কে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। কারওয়ান বাজারে ধানমন্ডি থেকে বাজার করে বাসায় ফিরছিলেন আব্দুল মোত্তালিব। চারটি পলিথিনে তিনি কাঁচা বাজার নিয়েছেন। এসময় তার কাছে পলিথিন নিষিদ্ধ বিষয়ে জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলিথিন বন্ধ হলে আমার খরচ কমে যাবে। কারণ বাসার ময়লা পলিথিনে না দিলে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা নিতে চান না। এজন্য প্রতিমাসে আমার ৩০০ টাকার মতো বাড়তি পলিথিন কিনতে হয়। এখন বাজার করতে আসার সময় ব্যাগ আনতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে কিনা তা নিয়ে তিনি সন্ধিহান। কারণ এই পলিথিন কারখানার সঙ্গে অনেক কিছুই জড়িত। তাই তিনি বিকল্প তৈরি করে পলিথিন বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।’

কারওয়ান বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কাঁচাবাজারের দোকান করেন আব্দুল আলিম। তার কাছে পলিথিন বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি জানি। কিন্তু পলিথিনের বিকল্প কী? এর ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। নয়তো এই সিদ্ধান্ত কার্যকর খুবই কষ্টকর। মূলত পলিথিন উৎপাদন বন্ধ হলে এমনিতেই পলিথিন ব্যবহার কমে যাবে। আগে উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।’

দেশে কবে পলিথিন নিষিদ্ধ হয়?

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এর বিধান অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০২ সালের ১ মার্চ বিএনপি সরকার দেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তারপর পেরিয়েছে ২২ বছর। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, এরপর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসন করেছে। তবুও আইন থাকা সত্ত্বেও দেশে পলিথিন ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হয়নি। পলিথিন ব্যবহার কমার বিপরীতে সুপারশপ থেকে সবখানেই বেড়েছে পলিথিনের ব্যবহার। ২০০২ সালের পর ফের গতকাল থেকে সুপারশপে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে শ    ঙ্কায় ক্রেতা-বিক্রেতারা।

নিষিদ্ধ পলিথিন: ৫ বছরে দণ্ড পেয়েছেন কতজন?

নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধে পরিচালিত অভিযানে গত ৫ বছরে ৬ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। এই সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১৭০ জনকে; জব্দ করা হয়েছে দুই হাজার টনের বেশি মালামাল।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিগত সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী জাতীয় সংসদে এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবেশ বিনষ্টকারী পলিথিনের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম এবং ব্যবহার বন্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এ বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে। আইন অনুযায়ী বিভিন্ন পুরুত্বের পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন কার্যক্রম ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৫১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৪ হাজার ২০৭টি মামলা করে ৬ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।


পলিথিনের ক্ষতিকর দিক

পলিথিন মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে ২০০ থেকে ৪০০ বছর। মাটিতে বা জলাশয়ে থাকা ব্যাগগুলো পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতির কারণ হয়েছে, তা নিয়ে পরিবেশবিদরা বহু বছর ধরেই বলে আসছেন। পলিথিন  
ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে দেয়া হয় এসব পলিথিন ব্যাগ। ম্যানহোল, নালা, খাল, নদীতে পড়ে থাকা ব্যাগগুলো বৃষ্টি হলে বিপত্তি ঘটায়। পানি নামার পথ রুদ্ধ হয়ে থাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতার সমস্যা।

বিশেষ করে রাজধানীর খালসহ ম্যানহোলগুলো পলিথিন দিয়ে ভরাট হয়ে থাকে। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই রাজধানীজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এছাড়াও পলিথিন মাটিতে সহজে মিশে না, তাই এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান বলেন, ‘পরিবেশ, জনজীবন ও প্রকৃতির ওপর পলিথিন ব্যাগের ক্ষতির প্রভাব বিচার-বিশ্লেষণ করেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যখন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন সর্বস্তরের মানুষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এটির বিকল্পও তখন বাজারে আসতে শুরু করেছিল। যেমন, কাগজের ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ, পাটের ব্যাগ ও কাগজের ব্যাগসহ আরও অনেক কিছু। সেগুলো ব্যবহারে আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।  কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সেখান থেকে আমরা সরে আসি। এতে বিকল্পের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেল। আবার বাজারে পলিথিন আসতে শুরু করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও আইনের প্রয়োগ যথাযত হয়না। এ জন্য দায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর। সরকারিভাবে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। কিন্তু তারা সেটা পালন করেন না। যখন বলা হবে বাজারে পলিথিন বিক্রি বা ব্যবহার করা যাবে না, তখন সবাই চেষ্টা করবেন বাসা থেকে কাপড়ের ব্যাগ কিংবা বিকল্প কিছু নিয়ে যাওয়ার। সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে এটা।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত