চলতি বছরের মধ্যে গেল সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। এখনো কমছে না ডেঙ্গুর দাপট। প্রতিদিনই মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে সিটি করপোরেশনসহ কার্যত নাগরিক সেবা প্রদানকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত রয়েছেন। এ কারণে ডেঙ্গুজ¦রবাহী এডিস মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এতে ডেঙ্গুজ¦রের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ ছাড়া জনপ্রতিনিধি না থাকায় ঢাকাসহ সারা দেশের নগর এলাকায় নাগরিক সেবার মান তলানিতে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর ভর মৌসুমে মশক নিধন ছাড়াও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিসান সনদ, নাগরিক সনদ, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা, রাস্তাঘাট মেরামত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে যেকোনো সমস্যায় পড়লে নাগরিকরা ছুটে যেতেন কাউন্সিলরদের কাছে। এমনকি আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অনুপস্থিতিতে অনেক কাউন্সিলর সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করেছেন। তাদের অনুপস্থিতিতে সরকারি আমলাদের দিয়ে যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, তাতে নাগরিক সেবার শূন্যতা পূরণ হবে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে, চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩০ হাজার রোগীর মধ্যে গেল মাসেই আক্রান্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৯৭ জন। মারা যাওয়া ১৬৩ জনের ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে গত মাসে। এর মধ্যে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ডিএসসিসি এলাকায়। মশক নিধন কাজে গাফিলতির কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর এ সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়রদের অপসারণ করা হয়। এর ছয় সপ্তাহের মাথায় সরিয়ে দেওয়া হয় কাউন্সিলরদেরও। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৩২৩ পৌরসভার সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের অপসারণ করে গত বৃহস্পতিবার দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। একই সঙ্গে নাগরিক সেবা সচল রাখতে ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে সরকার, যেখানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা রয়েছেন। তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা কখনই জনপ্রতিনিধির বিকল্প হতে পারে না। জনপ্রতিনিধির মূল ভিত্তিই হলো জনগণ। তাদের সঙ্গে জনগণের সরাসরি সম্পর্ক থাকে, জবাবদিহিতা থাকে। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে এ কাজ কখনই ভালো হবে না। এতে মানুষের কষ্ট বাড়বে। তিনি বলেন, সরকার চাইলে সাময়িক সময়ের জন্য মেয়র-কাউন্সিলরের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিতে পারে। তাদের মাধ্যমে নাগরিক সেবা সচল রেখে দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
জনপ্রতিনিধি না থাকায় কর্মচারীরাও ঠিকমতো কাজ করছে না। ওয়ার্ড পর্যায়ে রাস্তাঘাটে ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকছে। কোথাও মশার ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। তাদের বলারও কেউ নেই। সাবেক জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে যাদের সরাসরি অবস্থান ছিল, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের বরখাস্ত করলে কোনো নাগরিক অসন্তুষ্ট হতো না। কিন্তু যারা ১৫ বছর স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের বরখাস্ত করায় জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সামান্য নাগরিক সেবার জন্য যখন আমলাদের পেছন পেছন ঘুরতে হচ্ছে, তখন সবাই জনপ্রতিনিধির অভাব বুঝতে পারছেন।
এদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নাগরিক সনদসহ অন্য সেবা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ২০টি জোনে ২০ জন কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করবেন। এ দুই সিটি করপোরেশনে ওয়ার্ড রয়েছে ১২৯টি। অন্য সিটি করপোরেশনেও এসব ক্ষমতা আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা গেছে।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম সেন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিএনসিসির জোন-৫-এ মোহাম্মদপুর এলাকায় সাতটি ওয়ার্ড, তেজগাঁওয়ে আছে তিন-চারটি ওয়ার্ড। এত বড় এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একজন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে। এই ১০-১২ জন কাউন্সিলরের কাজ একজন অফিসার কীভাবে সামলাবেন? উনাকে সব জনগণ চেনে না, উনিও সবাইকে চেনেন না। তাছাড়া সবাই উনার কাছে সহজে যাওয়ার সাহসও করবেন না।’
ডিএনসিসির ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘মানুষ আমাদের কাছে নানা সমস্যা নিয়ে আসছে, কিছুই করতে পারছি না। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে জনগণের কোনো উপকার হবে বলে মনে হচ্ছে না।’
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালন করার জন্য যাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণ তাদের চেনে না, তারাও জনগণকে চেনে না। জনগণ কোন জায়গা থেকে সেবা নেবে সেটা উল্লেখ নেই। মানুষ হয়রানি হচ্ছে, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
খুলনা সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের জনগণ সকাল থেকে বাসায় এবং অফিসে এসে নাগরিক সেবার জন্য যোগাযোগ করছে। জনগণের কোনো সমস্যা সমাধান দিতে পারছি না।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত (১, ২, ৩) ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ফেরদৌস বেগম মুন্নী বলেন, ‘যেসব ওয়ার্ডে পুরুষ কাউন্সিলর অনুপস্থিত ছিলেন, সেখানে জনগণ আমাদের কাছে এসে তাদের প্রাপ্য সেবাগুলো নিয়ে গেছেন। এখন সে সুযোগও রইল না। প্রতিদিনই বহু লোক সেবা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’
নাগরিকরা বলছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত বা মৃত্যু হলে আগে তো কাউন্সিলরকে বলতাম, মেয়রকে বলতাম; এখন কাকে বলব? রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত দুই মাস মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। মশার কামড়ে মানুষ মরছে। এখন কাকে ফোন করব, কার কাছে যাব?’ জুরাইন এলাকার বাসিন্দা ফকির আবদুল হালিম বলেন, ‘থানা পুলিশ ঠিকভাবে রেসপন্স করছে না। মেয়র নেই, কাউন্সিলর নেই।’
বাসাবো বিশ্বরোড থেকে নন্দীপাড়া পর্যন্ত সড়কটি খানাখন্দে ভরা। বাসাবো এলাকার বাসিন্দা লাবলু বলেন, ‘এই সড়কে প্রতিদিনই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এখন আমরা কার কাছে বলব, তাকেই খুঁজে পাচ্ছি না। ময়লা আবর্জনাও ঠিকভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে না।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয় অনুবিভাগ) এএইচএম কামরুজ্জামান বলেন, ‘মশক নিধনসহ নাগরিক সেবা চালু রাখতে আমরা প্রতিটি সিটি করপোরেশনে একটি করে কমিটি করে দিয়েছি। সিটি করপোরেশনগুলো চাইলে আরও উপকমিটি করে নাগরিক সেবা সচল রাখবে।’