বাংলাদেশের অলিগলিতে চলতে গেলে কানে ভেসে আসছে মৃদু ঢাকের আওয়াজ, কদিন বাদেই যে শারদীয় উৎসব। তবে সবকিছু ঠিক থাকলে আজ থেকেই দেশবাসী মেতে উঠতে পারত ক্রিকেট উৎসবের আমেজে। নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আজই বাংলাদেশে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভেন্যু বদলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বৈশ্বিক আসরটি। সেখানেই চমকপ্রদ খেলা, রোমাঞ্চকর মুহূর্ত এবং নতুন প্রতিভা আবিষ্কারের সম্ভাবনা নিয়ে মাঠে গড়াচ্ছে নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৪। শারজায় প্রথম ম্যাচেই বাছাই পেরিয়ে আসা স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যেখানে লড়তে দেখা যাবে জ্যোতি-নাহিদাদের।
গত দুই দশক ধরে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অস্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত ক্রিকেটবিশ্ব। স্বভাবতই ক্রিকেটের বাকি দুই ফরম্যাট টেস্ট এবং ওয়ানডেকে পিছে ফেলে নিজের মারকাটারি বৈশিষ্ট্যের জন্য দর্শক জনপ্রিয়তার শিখর দখল করে নিয়েছে নবাগত ক্ষুদ্রতম এ সংস্করণটি। স্টেডিয়াম কিংবা টেলিভিশন-মুঠোফোনের পর্দাতেও বেশি ভক্তদের টেনে নিয়েছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টির কথা যখন বলা হয় স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের ক্ষিপ্রতাই বেশি চর্চিত হয়। যা গণমাধ্যমে এ ফরম্যাটে নারীদের জনপ্রিয়তা ও উপস্থিতিকে সবসময় পিছে ফেলে দেয়। এর পরও আশ্চর্য হতে হয় এটা জেনে যে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি দর্শক উপস্থিতি দেখা গিয়েছে নারীদের ক্রিকেটেই। ২০২০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া-ভারত ফাইনালে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে হাজির ছিলেন ৮৬ হাজার ১৭৪ জন ক্রিকেটপ্রেমী। ওই ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে পঞ্চম শিরোপা জিতেছিলেন অজি নারীরা। দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়া ২০২৩ আসরের বিশ্বকাপে পর্দায় খেলা দেখার পরিসংখ্যান ৪৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১৯২ মিলিয়ন ঘণ্টায়। নারী ক্রিকেটের এমন জাগরণের ঢেউ নিয়ে নড়েচড়ে বসে আইসিসি। সেই সঙ্গে এটি যে শুধু একটি ক্রীড়া ইভেন্ট নয়, বরং নারীদের ক্রিকেটের উন্নয়ন ও প্রসারের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা টের পেয়েছে আইসিসি। আজ থেকে শুরু বিশ্বকাপের আর্থিক পুরস্কার (প্রাইজমানি) গত আসরের তুলনায় তাই ২২৫ শতাংশ বাড়িয়ে পুরুষ বিশ্বকাপের সমপরিমাণ করেছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
গেল আসরের মতো এবারও নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মোট ১০টি দল। প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুটি দল পৌঁছাবে সেমিফাইনালে। সেখান থেকে বিজয়ীরা ফাইনালে লড়বেন শিরোপার জন্য। গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচই তাই হয়ে উঠবে আসরের গতিনির্ধারক। সংক্ষিপ্ত অথচ অপ্রত্যাশিত মুহূর্তগুলোই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট তথা এ বিশ্বকাপকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে নিঃসন্দেহে। আমিরাতের শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া এবং পিচের বৈচিত্র্য দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে স্পিনারদের জন্য এ ধরনের উইকেট বেশি সহায়ক হওয়ায় যেসব দলে দক্ষ স্পিনার রয়েছেন তারা বাড়তি সুবিধা পাবেন। ব্যাটারদের জন্য পরিস্থিতি হতে পারে প্রতিকূল, বিশেষ করে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট আরও মন্থর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। যা প্রযোজ্য আসরের দুই ভেন্যু শারজা ও দুবাই দুটোর ক্ষেত্রেই।
বর্তমান ও রেকর্ড ৬ বারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া দলে রয়েছেন অভিজ্ঞ এবং প্রতিভাবান ক্রিকেটাররা, যারা অতীতেও তাদের দক্ষতা দেখিয়েছেন। বিধ্বংসী উইকেটকিপার ব্যাটার অ্যালিসা হিলির নেতৃত্বে অজিদের সামনে রয়েছে শিরোপা ধরে রাখার বিশেষ চ্যালেঞ্জ কেননা অন্য দলগুলোও এবার শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সেই তালিকায় বড় নাম ভারত। যারা আগের আসরগুলোতে ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখিয়ে এসেছে। স্মৃতি মান্ধানা, শেফালি ভার্মা এবং হারমানপ্রিত কওরের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা ভারতকে শীর্ষস্থানে নিতে প্রস্তুত। ভারতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ফাইনাল পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। ফেভারিটদের তালিকায় রয়েছে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ডও। শক্তিশালী এ দলগুলোর ব্যাটিং ও বোলিংয়ের ক্ষেত্রে গভীরতা এবং অভিজ্ঞতা। যেকোনো পরিস্থিতিতে বাজির দান উলটে দিতে সক্ষম এদের সবাই।
এবারই প্রথম কোনো আইসিসি ইভেন্টে ব্যবহৃত হবে ‘স্মার্ট রিপ্লে সিস্টেম’। দ্য হানড্রেড ও আইপিএলে ব্যবহার হওয়া এ প্রযুক্তির অধীনে ২৮টি ক্যামেরার সহায়তায় মাঠে থাকা আম্পায়ারদের তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে থাকবেন দুই হকআই অপারেটর। এছাড়া ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস) তো থাকছেই। গত আসরের মতো এবারও আম্পায়ার প্যানেলের পুরোটাই সাজানো হয়েছে নারীদের নিয়ে। তবে আসরের সফলতা নির্ভর করবে দিনশেষে মাঠের ক্রিকেটেই। ব্যাট-বলের দামামার মধ্যে উত্তেজনার পারদ যতখানি তুঙ্গে উঠবে ততটাই সাফল্যের স্বীকৃতি পাবে নারীদের ক্রিকেট। নতুন আরেকটি বিশ্বকাপে বিশ্বমানের খেলা, নতুন প্রতিভাদের ঝলক এবং রোমাঞ্চ মিলিয়ে জয় হোক নারী ক্রিকেটের।