সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বা ৩৩ বছর হতে পারে বলে সরকারি বিভিন্ন সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। তবে বয়সসীমা যে বাড়তে পারে, তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী; যিনি সম্প্রতি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন।
গতকাল বুধবার চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মুয়ীদ চৌধুরী। সেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে মুয়ীদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, কভিড মহামারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজটের সমস্যাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টি যৌক্তিক। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরও বলেন, ‘এই কমিটির একটাই ফোকাস, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পর্যালোচনা। এটা নিয়ে অনেকদিন ধরে একটি আন্দোলন চলছে। বয়স বৃদ্ধির দাবিতে যারা আন্দোলন করছে তাদের সঙ্গে আমরা বসেছিলাম। সরকারের বর্তমান নীতিমালা, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে সবকিছু চিন্তা করে আমরা এ বিষয়ে সুপারিশ করব।’ এক প্রশ্নের জবাবে মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, ‘বয়স কতটুকু বাড়ানো দরকার, এটা আমি আজ বলতে পারছি না। আমরা সবকিছু পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব কতটুকু বাড়ানো যায়।’
আন্দোলনরতদের প্রতিনিধি রাসেল আল মাহমুদ বলেন, বয়সসীমা পর্যালোচনা কমিটির সঙ্গে আমাদের ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ আলোচনা হয়েছে। উনারা আমাদের যুক্তিগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কী সিদ্ধান্ত আসে আমরা সেটার অপেক্ষায় থাকব।’
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর। আর অবসরে যাওয়ার বয়স ৫৯ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর।
এটি ৩৫ করার দাবিতে কয়েক বছর ধরেই ‘চাকরিতে আবেদনের বয়স ৩৫ প্রত্যাশী শিক্ষার্থী সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সেই দাবি একাধিকবার নাকচ করে দেয়।
এ ছাড়া, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার দাবিও তুলেছেন সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশ। তবে কমিটি শুধু চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টিই বিবেচনায় রাখবে।
গণ-আন্দোলনে গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর পর থেকে নানা দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচির মধ্যে মাঠে নামেন বয়সসীমা নিয়ে আন্দোলনকারীরাও।
গত সোমবার তারা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবনের সামনে জমায়েত হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে তারা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকও করেন। পরে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ নিতে মুয়ীদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিটি গঠন করে সরকার। সাত কার্য দিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ ও অবসরের বয়স ৬৫ বছর করতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন’ গত ৫ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আবেদন করেছে। পরে ১৮ সেপ্টেম্বর সেই চিঠি বা প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ দশমিক তিন বছর, যা আজ থেকে দুই দশক আগের তুলনায় বেশি। যারা দাবি তুলে ধরছেন তারা মনে করে, জীবনকালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরির বয়সসীমা নির্ধারণ করা উচিত।
তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, অবসরের সময় বাড়ালে পেনশনের চাপ বিলম্বিত হবে। অর্থনৈতিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়তে হবে সরকারকে।
বাংলাদেশের বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার পেছনে। চলতি অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তার আগে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৭৭ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।
সে ক্ষেত্রে অবসরের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব মেনে নিলে সরকারকে এ খাতে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধিসংক্রান্ত আরেকটি জটিলতার জায়গা হলো বেকারত্ব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের হিসাবে বাংলাদেশে এখন বেকারের সংখ্যা ২৫ লাখ ৯০ হাজার। যদিও বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি বলেই মত অর্থনীতিবিদদের।
এ ছাড়া, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিসের তথ্যানুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে যুব বেকারত্বই প্রায় ৮০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের তরুণদের সরকারি চাকরির প্রতি ঝোঁক এখন বেশি। চাকরিতে প্রবেশের বয়স আরও বৃদ্ধি করা হলে এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণদের অনেকে ‘একদিন না একদিন সরকারি চাকরি হবে’ আশায় শেষ পর্যন্ত চাকরির প্রস্তুতি নেবে। ফলে, দীর্ঘসময় পর্যন্ত এই তরুণদের কাজে লাগানো যাবে না বিধায় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের মতে, বয়সসীমা বাড়ানোটা যৌক্তিক না। কারণ ১০ বছর ধরে সেশনজটের ঝামেলা না থাকায় একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত পড়াশোনা করলে ৩০ বছর পর্যন্ত অন্তত সাতবার পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। বয়সসীমার একদম শেষ প্রান্তে এসে চাকরিতে প্রবেশকারীরা তরুণ চাকরিজীবীদের সঙ্গে কতটা খাপ খাইয়ে চলতে পারবেন, সেটি নিয়েও ভাবনার বিষয় আছে।