জায়গা পছন্দ হলেই দখল

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আবুল কালাম আজাদ। উপজেলা জুড়ে পরিচিত ছিলেন ভয়ংকর ত্রাস হিসেবে। তাহেরপুর পৌরসভার তিনবারের মেয়র, আর সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিতভাবে এমপি নির্বাচিত হয়ে এলাকা জুড়ে তার দখলবাজির চিহ্ন রেখে গেছেন। যখন যে জায়গা বা সম্পদ পছন্দ হয়েছে, দখলে নিয়েছেন কালাম। গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস ছিল না কারও, এমনকি দলীয় লোকজনও তার বিপক্ষে কথা বলতে পারেননি। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, জায়গা-জমি, পুকুর এবং কলেজ ও মন্দিরের জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই এমপির বিরুদ্ধে। করেছেন নিয়োগ-বাণিজ্যও। আর এসবের মাধ্যমে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বাগমারা জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করলেও ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সপরিবারেই পালিয়েছেন এলাকা ছেড়ে।

কালাম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই এলাকাবাসীর। এমপি হওয়ার পর মাত্র সাত মাস দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। এই স্বল্প সময়েই বাগমারা জুড়ে অন্তত পাঁচ হাজার বিঘা ফসলি জমিতে জোর করে পুকুর খনন করেছেন। গণহারে ফসলি জমিতে পুকুর খনন করায় এলাকায় অনেকেই আড়ালে-আবডালে সাবেক এমপি কালামকে ‘ভেকু কালাম’ বলে সম্বোধন করতেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আবুল কালাম আজাদের দাপট শুরু। প্রথমদিকে তার ত্রাসের রাজত্ব ছিল শুধু তাহেরপুর পৌর এলাকায়। ২০২১ সালের পৌর নির্বাচনে তিনি তৃতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন। আর সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথমবারের মতো এমপি হন। এমপি নির্বাচন করতে গিয়ে মেয়রের পদ ছাড়তে হয় কালামকে। এমপি হওয়ার পর তিনি তাহেরপুর পৌরসভার মেয়র পদে স্ত্রী সায়লা পারভীনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করে আনেন। কালামের রোষের শিকার হওয়ার ভয়ে অন্য কেউ মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাহস পাননি।

তাহেরপুর পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কালাম। এমপি হওয়ার পর অন্যের জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণ এবং কৃষিজমি নষ্ট করে পুকুর খননসহ এমন কোনো অবৈধ কাজ নেই, যা করেননি তিনি।

তাহেরপুর এলাকার কল্যাণ কুমার। ভিটেমাটি বলতে ছিল মাত্র তিন কাঠার ওপর বাড়ি। যার খাজনার টাকা এখনো তিনিই দিচ্ছেন। কিন্তু বছরখানেক আগে তৎকালীন মেয়র কালাম তাকে বলেন, জমিটা তিনি নিজের নামে করে নিয়েছেন। কল্যাণের মতো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাটির অনেক মানুষেরই অভিযোগ তাদের বসতভিটা দখলের। বিনা নোটিসে অন্তত ২০টি হরিজন পরিবারকে অবৈধভাবে স্থানচ্যুত করে মার্কেট গড়েছেন সাবেক এই এমপি।

এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়র হওয়ার আগে আবুল কালাম আজাদ আর্থিকভাবে খুবই অসচ্ছল ছিলেন। এখন তাহেরপুর পৌর এলাকায় ১০ কাঠা জমির ওপর রয়েছে তার দোতলা বাড়ি। আবুল কালাম আজাদ তার অবৈধ অর্থ আয়ের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজকে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকদের অভিযোগ, কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে মেয়র কালাম নিজেকে যুক্ত রেখেছেন দীর্ঘদিন। কলেজের সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে নির্মাণ করেছেন মার্কেট ও আবাসিক ভবন। অবৈধ নিয়োগসহ কলেজের অর্থ ও শিক্ষকদের সুরক্ষা তহবিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার সঙ্গে সখ্য ছিল আবুল কালাম আজাদের। যার সুবাদে হয়েছেন রাজশাহী জেলার ক্ষমতাধর এমপি।

বাগমারার তাহেরপুর সুপার মার্কেট নির্মাণ থেকে পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কালামের বিরুদ্ধে। সেখানে হরিজন (সুইপার) পল্লী ছিল। তাদের উচ্ছেদ করে অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা হয়নি। সরকারি খাদ্যগুদাম ভেঙে সেখানে মার্কেট নির্মাণের কাজ চলছে। ওই মার্কেটে দোকান বরাদ্দের নামে এলাকার অনেক মানুষের কাছ থেকে অন্তত ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কালামের বিরুদ্ধে। তাহেরপুর পৌর এলাকার হরিতলা মোড়ে সড়ক বিভাগের জায়গা দখলে নিয়ে মার্কেট নির্মাণ করে সেখানে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই মার্কেটে কে কে (কালাম-কুস্তরী) ফ্যাশন হাউজ নামে বড় একটি শোরুম করেছেন কালাম। তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের সামনে শতাধিক দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়। কিন্তু ভাড়া ও দোকান বরাদ্দের অর্থ কখনো পৌরসভার তহবিলে জমা হয়নি। শুধু তাই নয়; তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজের সামনে কলেজের শিক্ষক কোয়ার্টার দখল করে তিনি দশতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ভবন নির্মাণ করছেন। তাহেরপুর ভূমি অফিসের জায়গা ও পাশের একটি পুকুর অবৈধভাবে দখলে নিয়ে তা ভরাট করে গড়ছেন তিনতলা বাড়ি।

তাহেরপুর পৌর এলাকার বাসিন্দারা জানান, কালাম মেয়র থাকা অবস্থায় তাহেরপুর বাজারে অন্তত আট কোটি টাকা দামের এক খণ্ড জমি দখল করে নেন। ওই জায়গাটি তাহেরপুর মন্দিরের নামে থাকলেও কালাম মেয়র হয়ে সেটি দখল করে পাঁচতলা মার্কেট গড়ে তোলেন। তিনি পৌরসভার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি তার সহযোগীদের লাইসেন্সে নিজেই করতেন। এভাবে তিন মেয়াদে মেয়র থাকাকালে শুধু পৌরসভা থেকেই ঠিকাদারি ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গ্রামে তার আলিশান বাড়ি ছাড়াও রাজশাহী শহরের বড় বনগ্রাম এলাকায় রয়েছে ১০ কাঠা জমি। রাজশাহী নগরীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় রয়েছে ফ্ল্যাট। ঢাকায়ও রয়েছে ফ্ল্যাট। তার নিজের মালিকানায় রয়েছে ৩০টি পুকুর। এ ছাড়া লিজ নিয়ে প্রায় ৫০০ বিঘা আয়তনের পুকুরে মাছ চাষ করেন কালাম।

এতসব অনিয়ম-দুর্নীতি আর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে কালাম নিজের ঘনিষ্ঠ সাতজনকে নিয়ে ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ তৈরি করেন। এই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন কালামের ভাতিজা হাবিবুর রহমান হাবু, পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মনসুর মৃধা, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, পৌর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা, রাজু আহম্মেদ, আনোয়ার হোসেন ও আওয়ামী লীগ নেতা রতন সাহা।

ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক ২০০৮ সালে বাগমারা আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর বছর-তিনেক পরেই কালাম সাবেক এমপি এনামুলের সঙ্গে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। বাগমারার অন্যান্য এলাকায় এনামুলের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও কালামের নিয়ন্ত্রণে ছিল দক্ষিণ বাগমারা বলে পরিচিত তাহেরপুর ও গোয়ালকান্দি এলাকা।

দলীয় ফোরামেও ব্যাপক সমালোচিত ছিলেন কালাম। এমপি হওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রবিরোধী বক্তব্য দেওয়ায় আবুল কালাম আজাদকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয় কেন্দ্রীয় কমিটি।

অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যা নামলেই কালামের ক্যাডার বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা তিন-চারটা নম্বর প্লেটবিহীন মাইক্রোবাস নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় টহলে বের হতেন। তাহেরপুরের জামগ্রামে তার একটি টর্চার সেলও ছিল।