ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নিজেদের ভূ-খ-ে তেহরানের ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। তেমনটা হলে আরও তীব্রতার সঙ্গে ইসরায়েলে হামলার পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানও। এমন অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত তৈরির আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর ভয়ানক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের হামলার জেরে ইসরায়েল কী ধরনের জবাব দেবে সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরছে। ইসরায়েল এক সরকারি কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেন, তারা দ্রুত প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সামরিক ও গোয়েন্দা নেতারা প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছেন। সামরিক ও যুদ্ধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল যদি বড় পরিসরে ইরানে হামলা চালায়, সেক্ষেত্রে তেহরানের পারমাণবিক কেন্দ্র ও তেলের স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাদের মতে, ইরানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সব উপাদান রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প এবং তেলের অবকাঠামো ধ্বংস করতে ইসরায়েল সরকারের অনেকেই এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এরই মধ্যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার মোক্ষম সময় বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে সেটিতে সমর্থন না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ইসরায়েলের এ হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইরানে কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে সায় দেবে না তার প্রশাসন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান তিনি। তবে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার সেনা ও যুদ্ধ জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ইসরায়েলের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির চুক্তি করাতে ওয়াশিংটনের সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো ফলাফল আসেনি। উল্টো অঞ্চলটিতে সংকটাময় পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতির প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। এমনকি সেখানে বাইডেনের কূটনীতির ব্যর্থতাকে প্রতারণার সঙ্গে তুলনা করেন অনেক বিশ্লেষক।
এদিকে উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে কোন দেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে সেটিও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পায়। তবে সমরাস্ত্র বিবেচনায় খুব একটা পিছিয়ে নেই ইরানও। চলতি বছর এপ্রিলে ইসরায়েলে হামলার জন্য ইমাদ ও গদর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল ইরান। এসব ক্ষেপণাস্ত্র গতি শব্দের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। তবে সাম্প্রতিক হামলায় আরও দ্রুতগতির হাইপারসনিক ফাতেহ-২ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে তেহরান। এগুলোর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১০ হাজার মাইল। এ ছাড়া ইরানের কাছে রয়েছে শাহাব-৩ ক্ষেপণাস্ত্র। যা দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভা-ার বেশ সমৃদ্ধ।
আবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। আয়রন ডোম, অ্যারো ও ডেভিড সিøং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর তথ্যমতে, অ্যারো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একবার সক্রিয় করলে ৩৫ লাখ ডলার ব্যয় হয়। আর ডেভিডর সিøংয়ের ক্ষেত্রে এ ব্যয়ের পরিমাণ ১০ লাখ ডলার। ১০০ বা তার চেয়ে বেশিসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় হয়। তাই সব মিলিয়ে যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতি দুই দেশের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।