জান্তা হেফাজতে মারা গেছেন মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী নেতা ও কারাবন্দি নেত্রী অং সান সু চির ঘনিষ্ঠ ৭৩ বছর বয়সী ড. জাও মিন্ট। মৃত্যুর আগে তিনি মান্দালয়ের ওবো কারাগারে বন্দি ছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে মান্দালয় জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার (৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় ভোর ৩টায় তিনি মারা যান।
মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর খবরে বলা হয়, বিশিষ্ট এই রাজনীতিবিদ চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। এছাড়া তিনি মান্দালয় অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী এবং ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) ডেপুটি চেয়ার ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর অং সান সু চি ও এনএলডির অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি পূর্ববর্তী সামরিক শাসকদের দ্বারা বারবার কারাবরণ করেছিলেন। বর্তমান জান্তা সরকার লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত এই রাজনীতিককে দুর্নীতি ও নির্বাচনে জালিয়াতিসহ অভিযোগে মোট ২৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।
সূত্রের বরাতে ইরাবতী জানায়, জাও মিন্টের মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জান্তা কর্মকর্তারা হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলেন। তারা বলতে চেয়েছেন— ‘তাকে ক্ষমা করা হয়েছে’। মূলত এটি ছিল জান্তা সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে একটি মরিয়া প্রচেষ্টা।
এদিকে মান্দালয়ের গণতন্ত্রপন্থী কর্মী কো তাইজার জাও মিন্টের মৃত্যুতে জান্তার প্রতি অভিযোগের তীর ছুড়েছেন। তিনি বলেন, ‘জান্তাই (ড. জাও মিন্ট মংকে) হত্যা করেছে। মিন অং হ্লাইং সরকারই তার জীবন শেষ করেছে।’
‘জান্তাকে তাদের সব অপরাধ ও পরিণতির জন্য জবাবদিহি করতে হবে। তাদের এই পদক্ষেপের কোনো যৌক্তিকতা নেই,’ বলেন তাইজার সান।
কারাগারে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে এই নেতার মৃত্যু হয় বলে দাবি করেছে পলিটিক্যাল প্রিজনার্স নেটওয়ার্ক-মিয়ানমার। এক বিবৃতিতে তারা বলছে, মিয়ানমারের কারাগারে চলতি বছরই ১৩ জন রাজনৈতিক বন্দীকে হত্যা করা হয়েছে।
ড. জাও মিন্ট মংয়ের মৃতদেহ মান্দালয়ে তার বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং মঙ্গলবার তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। গত জুনে এনএলডির সাবেক পৃষ্ঠপোষক উ টিন ও’র মৃত্যুর পর তিনিই হলেন দ্বিতীয় শীর্ষ এনএলডি নেতা, যিনি মারা গেলেন।
নতজানু গণতন্ত্রের যোদ্ধা
মান্দালয় ইউনিভার্সিটি অফ মেডিসিনের প্রাক্তন ছাত্র ড. জাও মিন্ট মং ১৯৮৮ সালের গণতন্ত্রপন্থী অভ্যুত্থানের পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯০ (আমারাপুরা), ২০১২ (কিয়াউকপাদাউং), ২০১৫ (আমারাপুরা) এবং ২০২০ (আমারাপুরা) সালে এনএলডির হয়ে চারটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন।
১৯৯০ সালের নির্বাচনের পর তৎকালীন সামরিক সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে এবং প্রায় ২০ বছর ইয়াঙ্গুনের ইনসেইন কারাগার ও কাচিন রাজ্যের মিতকিনা কারাগারে আটক রাখে।
২০১৫ সালের নির্বাচনে দলের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তিনি মান্দালয় অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী এবং এনএলডির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। গণতন্ত্রের প্রতি তার অবিচল অঙ্গীকারের জন্য তিনি মান্দালয়ের অধিবাসী, এনএলডি দলের সদস্য এবং সমর্থকদের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার সময় এনএলডি নেত্রী অং সান সু চি তার এ নেতা সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তাকে এনএলডির মূল সদস্য এবং দলের শুরু থেকেই আমার একজন সহযোদ্ধা হিসেবে মূল্যায়ন করি।’
মিয়ানমারের বেসামরিক জাতীয় ঐক্য সরকার ও এর সংসদীয় কমিটি এবং এনএলডি তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করে ‘জাতির শহীদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এছাড়া শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বহু সাধারণ মানুষও।