অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় সকালে। ওইদিন বিকেলেই তা বাতিল করা হয়। একজন অতিরিক্ত সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব করার দুদিনের মাথায় তাকে করা হয় বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি)। একইভাবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ থেকে শুরু করে অন্যান্য পদের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনায় প্রশাসনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
পাশাপাশি নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে সচিবালয়ে উপসচিবসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের হট্টগোল, হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। এতে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রশাসনে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বদলি, ওএসডি আতঙ্কে রয়েছেন অনেক কর্মকর্তা। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে চরম ব্যাঘাত ঘটছে।
অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা নানা রকম সুবিধা নিয়েছেন, তাদের অনেকেই বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা বলে পদ-পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাসহ নানা অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিতদের তালিকায় থাকা একাধিক কর্মকর্তা এখনো বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। পাশাপাশি পদ না থাকার পরও পদোন্নতি দেওয়ার ফলে মাথাভারী হচ্ছে প্রশাসন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে রয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মো. মোখলেস উর রহমানের মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। এই মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রউফকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তা না ধরায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্যেষ্ঠতা ও মেধা অনুযায়ী অবশ্যই পদোন্নতি দেওয়া জরুরি। তাড়াহুড়ো করে পরিবর্তন কিংবা সংস্কার করা হলে এ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হবে। বর্তমান সময়ে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত বঞ্চিতরাই যাতে সুবিধা পান, সেই বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ারও দাবি উঠেছে।
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্বাভাবিক অবস্থায় অস্থির সিদ্ধান্ত। সকালের আদেশ বিকেলে বাতিল। বিকেলের আদেশ পরদিন সকালে বাতিল। এ রকম কত দিন চলবে জানি না। তবে দ্রুত এই পরিস্থিতির উত্তরণ দরকার। না হলে প্রশাসন অস্থির হয়ে উঠবে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একাধিক অতিরিক্ত সচিব ও উপসচিবের অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীদের আধিপত্য রয়েছে। নিয়োগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা প্রভাব বিস্তার করছে। যাচাই-বাছাই না করে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যখন আপত্তি উঠছে, তখন আবার তা বাতিল করা হচ্ছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) এ কে এম মতিউর রহমানকে পদোন্নতি দিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ৩ অক্টোবর তাকে ওএসডি করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মতিউর রহমান গত সরকারের সমর্থক হিসেবে প্রশাসনে পরিচিত এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার ঘনিষ্ঠ। কর ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে নিয়ে ২৯টি বই লিখেছেন।
এর আগে গত ১ অক্টোবর সকালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলাহী দাদ খানকে। বিকেলে ওই নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ইলাহী দাদ খান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। তার ব্যাপারে খোঁজখবর না নিয়েই খাদ্য সচিব পদে নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গত ১৪ আগস্ট জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব পদে মোকাব্বির হোসেনকে পদায়ন করে ১৭ আগস্ট তা বাতিল করা হয়। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সুফিয়া আক্তার রুমিকে গত ১০ সেপ্টেম্বর নিজ জেলা লক্ষ্মীপুরের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এক দিন পরই তা আবার বাতিল করা হয়।
দুই দফায় দেশের ৫৯ জেলায় নতুন ডিসি পদায়ন নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে নজিরবিহীন হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের ‘সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের’ ডিসি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এ-সংক্রান্ত দুটি প্রজ্ঞাপন বাতিলের দাবি জানান ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের এপিডি অনুবিভাগের দুই যুগ্ম সচিবকে কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন তারা। এ ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের একজন কর্মকর্তা এ সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে গেলে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা তার ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ধস্তাধস্তিও হয়। কর্মকর্তাদের রোষ থেকে নিজেকে বাঁচাতে যুগ্ম সচিব আলী আযম পাশের রুমের টয়লেটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সিনিয়র কর্মকর্তারা তাকে বের করেন।
বিক্ষোভের মুখে নবনিযুক্ত ডিসিদের মধ্যে আটজনের নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে ১৭ জন উপসচিবের মধ্যে আটজনের গুরুদন্ড, চারজনকে লঘুদন্ড এবং পাঁচজনকে তিরস্কারের সুপারিশ করেছে এ-সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান বলেছিলেন, পদায়নকৃত যেসব ডিসির বিরুদ্ধে যৌক্তিক অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো বিবেচনা করে আট জেলার ডিসি নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জনপ্রশাসনে নিয়োগ, পদায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো জায়গায় যদি সমস্যা থাকে যেটা ভ্যালিড, ক্লাসিফায়েড সেটা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এক দিনের ডিসি, এক দিনের কমিশনার, এক দিনের সচিব এটা নতুন কিছু না।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে এ ধরনের নিয়োগ না দেওয়ার কথাও জানিয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, একাধিক কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাচ্ছেন। এক যুগ বা এক দশক আগে অবসরে যাওয়া পাঁচ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের অনেকেরই পদোন্নতি হয়েছে এক দিনের মাথায়। এ ছাড়া চুক্তিতে কাউকে সচিব পদে নিয়োগ দিলে তার নিচের দিকের একাধিক যোগ্য কর্মকর্তা বঞ্চিত হন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জীবনবাজি রেখে ছাত্র-জনতা তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরশাসনের অবসান ঘটানোর পর থেকেই আমলারা তাদের পদোন্নতি-বদলিসহ নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করছেন। প্রায় প্রতিদিনই সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে ভিড় করছেন তদবিরকারী কর্মকর্তারা। অথচ আগের সরকারের নানা অপকর্ম বাস্তবায়নে প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরই ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ও তাদের বেশিরভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সচিবালয়ের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনেও এক ধরনের অস্থিরতা রয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে শক্তিশালী কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি।
অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জনপ্রশাসনে পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত ২৫৯ জনকে নিয়োগে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব থেকে উপসচিব, এরপর যুগ্ম সচিব ও সর্বশেষ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন। ৫ আগস্টের আগেও তারা ছিলেন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব। বিসিএস ১৫তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব থেকে তিন ধাপ পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন এবার।
এদিকে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন দাবিতে জোট বেঁধেছেন বিসিএস ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তাদের অভিযোগ, অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পদোন্নতিবঞ্চিত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা শুধু পদোন্নতি পাচ্ছেন। এতে শিক্ষা, তথ্য, কৃষিসহ অন্যান্য ক্যাডারে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।