ছাত্রনেতা থেকে নগরপিতা, শাহাদাতের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন  

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রদল নেতা থেকে নগরপিতা। মাঝে ৩৮ বছরের লম্বা রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। কারাগারে থেকে অংশ নিয়েছিলেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিবেশেই করেছিলেন দলের মনোনয়নে মেয়র পদে নির্বাচন। মেয়র নির্বাচিত হতে না পারলেও দলের নেতাকর্মীদের কাছে পেয়েছিলেন জনতার মেয়র খ্যাতি। হামলা-মামলা, জেল-হুলিয়া উপেক্ষা করেই রাজপথে ছিলেন একজন লড়াকু নেতা। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়ে শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের চেয়ারে বসতে যাচ্ছেন তিনি। বলছিলাম নির্বাচন কমিশন কর্তৃক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সদ্য ঘোষিত মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের কথা। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর আইনি লড়াইয়ের পর মঙ্গলবার তাঁকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সংশোধনী গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। 

এর আগে শাহাদাত হোসেনের দায়ের করা মামলায় ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমিন তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে দশ দিনের গেজেট প্রকাশের নির্বাচন কমিশন সচিবকে আদেশ দেন। 

কী ছিল মামলায় 

চসিক নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে কমিশন ঘোষিত ফলাফল বাতিল চেয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ৯ জনকে বিবাদী করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। মামলার বিবাদীরা ছিলেন— নির্বাচন কমিশন ঘোষিত মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান, নির্বাচন কমিশন সচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী আবুল মনজুর, এম এ মতিন, খোকন চৌধুরী, মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ ও মো. জান্নাতুল ইসলামকে। 

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে মামলায় অভিযোগ করা হয়, ভোটের দিন দুপুর পর্যন্ত ৪ থেকে ৬ শতাংশ ভোট পড়ে। কিন্তু কমিশনের হিসাবে দেখানো হয় ২২ শতাংশ ভোট পড়েছে। নির্বাচনে ভোটের হিসাব চেয়েও পাওয়া যায়নি। কোন কেন্দ্র থেকে ইভিএম এর প্রিন্ট কপিও দেয়া হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় নির্বাচনের নামে ওইদিন শুধু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। 

আদালতের পর্যবেক্ষণ 

চসিক নির্বাচন নিয়ে দেওয়া রায়ে আদালত তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, নির্বাচনের দিনের চিত্র, ঘটনা ও অনিয়ম এবং স্থানীয়, জাতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগে প্রতীয়মান হয় যে, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ২০২১ একটি পূর্বপরিকল্পিত তামাশার, প্রহসনের এবং সরকারি দল মনোনীত প্রার্থীকে মেয়র ঘোষণা দেওয়ার কৃত্রিম আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।’

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, চসিক নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ভোটের ফলাফলে সই করেন। কিন্তু কেন্দ্র-ভিত্তিক ফলাফল প্রকাশে জাল জালিয়াতি ও চরম অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। বিবাদীরা নির্বাচনী আইন ও বিধিমালাকে কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করে ১ নম্বর বিবাদী রেজাউল করিমের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিয়ে অন্যায় ও অবৈধভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন।

রেজাউল করিমকে নির্বাচিত ঘোষণা করতে রিটার্নিং অফিসারসহ বিবাদীর নির্বাচনী এজেন্ট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০, সিটি করপোরেশন (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা ২০১৬ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা ২০১৯ চরমভাবে লঙ্ঘন করেছেন বলে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে দুর্নীতি, বেআইনি ও যোগসাজশমূলক কার্যকলাপ এবং আচরণের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছেন বলেও রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়।

শাহাদাতের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার  

৩৮ বছর আগে ছাত্রদল দিয়ে রাজনীতি শুরু শাহাদাত হোসেনের। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে জড়িত হন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডে। ১৯৮৭ সালে কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয় তাঁকে। দুই বছরের মাথায় ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় তাঁকে। শিক্ষাজীবন শেষ হবার পর ১৯৯১ সালে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব এর সঙ্গে। এরপরই তিনি নজরে আসেন তারেক রহমানের। দায়িত্ব পান সংগঠনের চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতির। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রামের নির্বাচনে অংশ নিয়ে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই সময় নিজের এলাকায় বাকলিয়ায় শুরু করেন মূল দল বিএনপির রাজনীতি। ২০০১ সালে বাকলিয়া থানা বিএনপির সদস্য সচিব, ২০০৪ সালে সাধারণ সম্পাদক ও ২০০৭ সালে থানা বিএনপির সভাপতি হন তিনি। এসময় বাকলিয়া এলাকাকে বিএনপির শক্ত ঘাটি হিসেবে গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন শাহাদাত। ওয়ান ইলেভেনের সময় যখন দলের অনেক নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। কেউ দেশের বাইরে চলে যান আবার কেউ দেশের ভেতরে আত্মগোপনে চলে যান। এসময় কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকেরও দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৯ সালে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয় তাঁকে। আর সভাপতি হন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আমির খসরুর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নগর বিএনপিতে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে দলের কর্মী-সমর্থকদের কাছে নিজেকে গড়ে তুলেন তিনি। ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট ডা. শাহাদাতকে নগর বিএনপির সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে আরও দুই দফা নগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহাদাত। সর্বশেষ গত ১৩ জুন তাঁর নেতৃত্বাধীন নগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্য সচিব করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই মুহূর্তে দলের কোন পর্যায়ে দায়িত্বে না থাকলেও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন শাহাদাত।

মামলা ও কারাগার 

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে চিকিৎসক শাহাদাতকে। ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় শতাধিক রাজনৈতিক মামলায় আসামী করা হয় তাঁকে। মাসের অধিকাংশ দিনই মামলা হাজিরা দিতে দৌড়াতে হয় আদালত পাড়ায়। কারাগারে বন্দী অবস্থাতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের কাছে পরাজিত হন তিনি। 

যা ছিল শাহাদাতের নির্বাচনী ইশতেহারে 

বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হিসেবে ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি দলীয় নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ঘোষিত ইশতেহারে চট্টগ্রাম নগরকে ঘিরে তাঁর নয়টি অগ্রাধিকার ও তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্যে প্রথমেই ছিল ‘জলাবদ্ধতা মুক্ত চট্টগ্রাম’। এছাড়াও চট্টগ্রামকে স্বাস্থ্যকর, শিক্ষাবান্ধব, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সাম্য-সম্প্রীতির, নান্দনিক, তথ্য প্রযুক্তি ও সহনীয় গৃহকর সমৃদ্ধ নগরী হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। মেয়র পদে আসীন হবার পর সেই প্রতিশ্রুতি কতটুকু বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন সেটাই এখন দেখার বিষয়।