ক্ষমতার অপব্যবহার ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে ৬০ কোটি ৫৫ লাখ ৯৯ হাজার ১৫৬ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর প্রতিটি মামলায় আসাদুজ্জামানকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ৩৬টি ব্যাংক হিসাবে ৪১৬ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ১০৯ টাকা লেনদেনের মাধ্যমে স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর করায় মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৮২ লাখ ৫৬ হাজার ১৪২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এসব মামলা করা হয় বলে জানিয়েছেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) আক্তার হোসেন।
তিনি বলেন, আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে ১৬ কোটি ৪১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ টাকা, তার স্ত্রী লুৎফুল তাহমিনা খানের বিরুদ্ধে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯১ টাকা, তাদের দুই সন্তান শাফি মোদাচ্ছের খানের বিরুদ্ধে ১৯ কোটি ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫০২ টাকা এবং শাফিয়া তাছনিম খানের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চারটি মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের ৩৬টি ব্যাংক হিসাবে ৪১৬ কোটি ৭৪ লাখ ৬৮ হাজার ১০৯ টাকা লেনদেন-সংক্রান্ত মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক কর্মকর্তা আক্তার হোসেন আরও বলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এপিএস মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৮২ লাখ ৫৬ হাজার ১৪২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি মামলা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১২টি ব্যাংক হিসাবে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা লেনদেন-সংক্রান্ত মানিলন্ডারিং অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। মামলার এজাহার অনুযায়ী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের চেয়ে তার এপিএস মনির হোসেনের অবৈধ সম্পদের পরিমাণ বেশি।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আসাদুজ্জামান খান ১ কোটি ৫৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫০ টাকার স্থাবর ও ১৭ কোটি ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৪ টাকার অস্থাবরসহ মোট ১৯ কোটি ৬১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেন। এর মধ্যে তার গ্রহণযোগ্য আয় ৩ কোটি ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৯০ টাকা। বাকি ১৬ কোটি ৪১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ টাকা অর্জনের কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। এসব সম্পদ তিনি অবৈধ উপায়ে অর্জন করে নিজ ভোগদখলে রেখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করায় মামলাটি করা হয়। দুদকের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে এ মামলাটি করেন। আরেক মামলায় তার বিরুদ্ধে আটটি ব্যাংক হিসাবে ৫৫ কোটি ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৬ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন করতে স্থানান্তর ও রূপান্তর করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আসাদুজ্জামান খানের স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা : চারটির মধ্যে একটি মামলায় লুৎফুল তাহমিনা খান ও তার স্বামী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামি লুৎফুল তাহমিনা খান তার স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ১৫ কোটি ৪৬ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯১ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জন করে ভোগ দখলে রাখায় মামলাটি করা হয়েছে। স্ত্রীকে অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহযোগিতা করায় আসাদুজ্জামানকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় লুৎফুল তাহমিনা খানের বিরুদ্ধে ১০টি ব্যাংক হিসাবে ১৬৬ কোটি ৬৬ লাখ ১৩ হাজার ৭১ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস গোপনে স্থানান্তর ও রূপান্তর করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুই সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা : সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে তার দুই সন্তানের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলায়ও আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে শাফি মোদাচ্ছের খানের বিরুদ্ধে করা মামলায় ১৯ কোটি ৮৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫০২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ১৬৭ কোটি ৮১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭০ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন করতে স্থানান্তর ও রূপান্তর করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া শাফিয়া তাছনিম খানের বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৯ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ২৬ কোটি ৩৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৪২ টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ করে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন করতে স্থানান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগ করা হয়েছে।
এপিএস মনির হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা : ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ১৮ কোটি ৮২ লাখ ৫৬ হাজার ১৮২ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এপিএস মনির হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এতে তার বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ ১২টি ব্যাংক হিসাব থেকে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তরের মাধ্যমে গোপনে মানিলন্ডারিং অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।