পূজামন্ডপে সংগীত বিতর্কে আটক ২

নগরের জে এম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজা মন্ডপের স্টেজে ইসলামি গান পরিবেশন বিতর্কের ঘটনায় দুই মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করেছে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ দুজনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির বহিষ্কৃত যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্ত ও সংগীত পরিবেশনকারী ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) মুখপাত্র উপকমিশনার রইছ উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইতিমধ্যে দুজনকে আটক করেছি। তারা দুজনই স্থানীয়

মাদ্রাসার শিক্ষক। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি সজল দত্তের আমন্ত্রণে তারা সেখানে সংগীত পরিবেশন করেছেন। সজলের অনুরোধে তারা ছয়জন মঞ্চে উঠে সংগীত পরিবেশন করেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সজল দত্তের খোঁজ করছি। এখনো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা জানতে আমরা কাজ করছি।’

এ ঘটনায় পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তকে বরখাস্তের ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজাম-পে পূজা কমিটির অনুমতি নিয়ে চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমি নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছয় সদস্য মঞ্চে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া দুটি গান পরিবেশন করেন। যা পরে বিতর্কের জন্ম দেয়।

চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমির সভাপতি সেলিম জামান বলেন, ‘পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তের আমন্ত্রণেই সেখানে সংগীত পরিবেশন করতে গিয়েছি আমরা। সেখানে দুটি গান পরিবেশন করা হয়েছে, দুটিই সম্প্রীতির সংগীত। কেউ কেউ ভিডিও এডিট করে ভিন্ন গান বাজিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দুটি গানের মধ্যে একটি গান ছিল ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান’ অন্যটি হচ্ছে ‘শুধু মুসলমানের লাগি আসেনিকো ইসলাম’। এ দুটি গান গাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ভিডিওটি। ছড়িয়ে পড়া তিন মিনিটের একটি ভিডিওটিতে দেখা যায়, মন্ডপের অনুষ্ঠানের মঞ্চে গান পরিবেশন করছেন ছয় তরুণ।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রের দাবি, সন্ধ্যায় মঞ্চে নাচের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। এ সময় কয়েকজন তরুণ সেখানে উপস্থিত হয়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন বলে মঞ্চে ওঠেন। পরে তারা দুটি গান পরিবেশন করেন। এরপর তারা ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে নেমে চলে যান।

মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক সুকান্ত মহাজন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ওই তরুণরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্তকে বলেছেন, তারা মঞ্চে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করবেন। পরে তারা উঠে গান শুরু করেন এবং দুটি গান পরিবেশন শেষে তারা চলে যান।’

পূজাম-পে ইসলামি গান পরিবেশনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা হবে।’

এ ঘটনায় ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার রাতেই নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টের মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের অবস্থান তুলে ধরে এ দাবি জানান তিনি।

পোস্টে জাহিদুল ইসলাম লেখেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে অনেকেই ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন। আমি দায় নিয়ে বলছি, এর সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শিবির কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কাজ কখনোই সমর্থন করে না। তাই এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’

সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা : কোতোয়ালি থানা সূত্র জানায়, জে এম সেন হল পূজাম-পে ইসলামি সংগীত পরিবেশনের ঘটনায় মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের অর্থ সম্পাদক সুকান্ত বিকাশ মহাজন বাদী হয়ে সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার আসামিরা হলেনÑ পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক সজল দত্ত, সংগীত পরিবেশনকারী চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমির শিল্পী শহীদুল করিম (৪২), মো. নুরুল ইসলাম (৩৪), আবদুল্লাহ ইকবাল (৩০), রনি (২৮), গোলাম মোস্তফা (৩৬) ও মো. মামুন (২৮)।

ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১০ অক্টোবর সন্ধ্যার নগরীর জে এম সেন হল পূজাম-পে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পূজা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজল দত্ত চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমির একদল শিল্পীকে গান পরিবেশনের অনুরোধ করেন। তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে রাত ৮টায় তাদের ছয় শিল্পী অনুষ্ঠানে যান এবং একটি ইসলামিক গান ও একটি বাউল গান পরিবেশন করেন। এর মধ্যে একটি গানের ভাষায় শব্দচয়ন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে বলে প্রতীয়মান হয়। অনুষ্ঠানে পরিবেশন করা গান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়াসহ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

সজল দত্তকে পূজা কমিটি থেকে বহিষ্কার : চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমিকে পূজাম-পে ইসলামি গান পরিবেশনের সুযোগ দিয়ে ধর্ম অবমাননা ও সনাতনীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজল দত্তকে পূজা কমিটি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ ভট্টাচার্য ও সাধারণ সম্পাদক হিল্লোল সেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ঘটনার জন্য সজল দত্তকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করে সংগঠনের জরুরি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়।

মহানগর বিএনপির নিন্দা : চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ও সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে পূজামন্ডপে গিয়ে ইসলামি সংগীত পরিবেশনের ঘটনাকে অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করে এর নিন্দা জানিয়েছেন। বিএনপি নেতারা বলেন, জে এম সেন হলে যা ঘটেছে তার জন্য কার দায় কতটুকু, এর পেছনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। বিবৃতিতে বলা হয়, যারা মঞ্চে উঠে গান করেছেন, তারা সুবিবেচনার পরিচয় দেননি। এটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামান্তর।