একেই বলে নিজের অবস্থান নিজেই নষ্ট করা। চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত শুনেই মসনদের গন্ধে তড়িঘড়ি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে ঘোষণা দেন তরফদার রুহুল আমিন। এর ক’দিন পর তাবিথ আউয়াল একই পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিতেই আগ্রহে ভাটা পড়ে তরফদারের। মনোনয়নপত্র বিলির শেষ দিনে ফের নির্বাচনমুখী এই ব্যবসায়ী। তবে সভাপতি পদে নন, তাবিথের পথ পরিষ্কার করে তিনি সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। তাতে সভাপতি পদ নিয়ে আগ্রহে ভাটা পড়েছে। এখন বাফুফে নির্বাচনের সব আগ্রহ সিনিয়র সহ-সভাপতি পদ নিয়ে। কারণ আগেই যে এই পদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বাফুফের বর্তমান সহ-সভাপতি ও বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান।
ফুটবল প্রশ্নে সাইফ পাওয়ারটেকের কর্ণধার রুহুল আমিনের রঙ বারবারই বদলায়। অতীতেও হয়েছে এমনটা। আগ-পিছ বিচার না করে একের পর এক অপরিণত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেঁসেছেন তিনি। ২০২০ নির্বাচনের আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা। ২০১৬ নির্বাচনে কাজী সালাউদ্দিনের প্যানেলের প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন রুহুল আমিন। আওয়ামী সরকারের মন্ত্রী-এমপি-মেয়রদের ম্যানেজ করে বড় ব্যবসায়ী বনে যাওয়া রুহুল আমিন সেই নির্বাচনের এক বছর পরই ঘোষণা দিয়ে বসেন পরের বার সভাপতি নির্বাচনের। কাউন্সিলরের কাছে টানতে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থও ব্যয় করেন। তিন বছর আগেই সভাপতি হওয়ার ঘোষণা সালাউদ্দিনকে দেয় যথেষ্ট সময়। ধীরে ধীরে পথের কাঁটা রুহুল আমিনকে নির্বাচনী ময়দান থেকে বিতাড়িত করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সহায়তায়। পদ মিলবে না, তাই ফুটবল থেকে আগ্রহ শেষ হয়ে যায় রুহুল আমিনের। শেষ চার বছরে একে একে প্রিমিয়ার লিগ থেকে সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবকে তুলে নেন। এরপর নিচের সারির লিগেও দল রাখেননি। সর্বশেষ কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম আবাহনী থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেন। দলবদলের আগ মুহূর্তে স্পন্সর করতে রাজি না হওয়ায় দল গড়াই প্রশ্নের মুখে পড়ে গিয়েছিল চট্টগ্রামের ক্লাবটির। দলবদলের শেষ দিন জাতীয় দলের সাবেক দুই অধিনায়ক জাহিদ হাসান এমিলি ও মামুনুল ইসলামের উদ্যোগে কোনো মতে একটা দল গড়ে তারা। এরপর সালাউদ্দিনের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণায় রুহুল আমিনের ফুটবলে ভালোবাসা ফেরা এবং সভাপতি পদে নির্বাচনের অপরিণত ঘোষণা। শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থানে থাকতে না পেরে নিজেকেই খেলো করা।
তরফদার ঘোষণা দিয়েছেন ঠিক। তবে তাকে জিততে হলে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ তার প্রতিদ্বন্দ্বী বসুন্ধরা কিংসের ইমরুল হাসান। বসুন্ধরা গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ কর্তা দীর্ঘদিন ধরে সফল ক্লাব পরিচালনার পাশাপাশি বাফুফেতেও নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন গেল চার বছর। সালাম মুর্শেদী সিনিয়র সহ-সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগের পর এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আরও তিন সহ-সভাপতি নিরুদ্দেশ হওয়ায় বাফুফের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাকে। আবার সেগুলো সফল বাস্তবায়নের দায়িত্বও নিতে হচ্ছে। বাফুফের ফিন্যান্স কমিটি, পেশাদার লিগ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হচ্ছে। তাছাড়া কাউন্সিলরদের কাছে তার জনপ্রিয়তা নিয়েও নেই কোনো প্রশ্ন। সেটা তো গত নির্বাচনের প্রমাণিত। নতুন মুখ হয়েও সেবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সহ-সভাপতি হয়েছিলেন ইমরুল। এসব দিক চিন্তা করলে রুহুল আমিনের জন্য কাজটা মোটেই সহজ নয়। বিশেষ করে বারবার নিজের অদূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়ে এমনিতেই অবস্থান হারিয়েছেন। এই পদে মনির হোসেন নামে এক অপরিচিত ব্যক্তি মনোনয়ন সংগ্রহ করলেও সব কিছু ঠিকভাবে চললে লড়াইটা হবে রুহুল আমিন-ইমরুলেই।
রুহুল আমিনের এমন সিদ্ধান্তে খুশি নন এতদিন ধরে তার পেছনে থাকা জেলা, বিভাগ ও ক্লাবের কতিপয় ব্যক্তি। তাদেরই একজন ময়মনসিংহ বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কাউন্সিলর আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদুয়ান বাধ্য হয়ে সভাপতি পদে মনোনয়ন নিয়েছেন। এছাড়া মনির হোসেন নামে একদম অপরিচিত এক ব্যক্তি এই পদে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন শেষ দিনে।
সহ-সভাপতি পদে মোট ১২জন মনোনয়ন নিয়েছেন। এই তালিকায় আছে রেদুয়ানের নামও। এছাড়া প্রথম দিন নির্বাহী সদস্য ফরম তোলা সাবেক ফুটবলার সত্যজিৎ দাস রুপু শেষ দিনে সহ-সভাপতির ফরম তুলেছেন। এছাড়া সাবেক তারকা রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির, গত নির্বাচনে সভাপতি পদে দাঁড়িয়ে এক ভোট পাওয়া সাবেক ফুটবলার ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক ও সাবেক গোলকিপার ছাঈদ হাছান কানন সহ-সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন।
প্রথম দিনে নির্বাহী সদস্য পদে বিক্রি হয়েছিল ২৪টি মনোনয়নপত্র। শেষ দিনে ১৫টি নির্বাহী পদের জন্য আরও ১৯টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪৩ জন ফরম নিয়েছেন এই পদে। তারা হলেন তাসমিয়া রেজওয়ানা, শাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া, ইয়াকুব আলী, মো. ইকবাল হোসেন, কামরুল হাসান হিলটন, গোলাম গাউস, জাকির হোসেন চৌধুরী, মো. নজরুল ইসলাম, এ বি এম মনজুরুল আলম দুলাল, মাহফুজা আখতার কিরণ, হাজি মো. টিপু সুলতান, এ এন এম আমিনুল হক মামুন, ইমতিয়াজ হামিদ, সত্যজিত দাশ রুপু, মনোষ চন্দ্র দাস, আমিরুল ইসলাম বাবু, বিজন বড়ুয়া, মাহমুদা খাতুন, মো. আমের খান, মো. এহলাস উদ্দিন, মো. শফিকুল আজম ভূঁইয়া, শরীফ উদ্দিন, মো. মনজুরুল করিম, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. ইকবাল হাসান জনি, মাহী উদ্দিন আহমেদ সেলিম, মো. সাইফুর রহমান মনি, খন্দকার রাকিবুল ইসলাম, রওশন আখতার (ডেইজি জাফর), মোহিদুর রহমান মিরাজ, মো. মনজুরুল করিম, মো. শাহাদাত হোসেন, মো. আব্দুল হাফিজ, জসিম উদ্দিন খান খসরু, সৈয়দ মো. শহিদুল ইসলাম, মো. রিয়াজউদ্দিন, এ কে এম নুরুজ্জামান, মিসবাহ আহমাদ বিন সামাদ চৌধুরী, মো. সৈয়দ হাসান কানন, মো. মাহবুবুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন, শাকিল মাহমুদ চৌধুরী, মো. শাহীন হাসান।
দুর্গাপূজার জন্য আজ কোনো কর্মকা- নেই নির্বাচন কমিশনের। ১৪ ও ১৫ অক্টোবর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়। এর পরের দিন হবে যাচাই-বাছাই। ১৮ অক্টোবর দাখিলকৃত মনোনয়নপত্রের ওপর আপিল কমিশন শুনানি করবে। ১৯ ও ২০ অক্টোবর মনোনয়ন প্রত্যাহার এবং ২০ তারিখ বিকেলে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেদিনই আসলে বোঝা যাবে ২৬ অক্টোবর নির্বাচনের জন্য কারা লড়বেন, কারা ঝরে যাবেন আগেভাগেই।