বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের পাঁচতলার মেডিসিন ভবনে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। গতকাল রবিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালের বর্ধিত নতুন মেডিসিন ভবনের নিচতলায় এ আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট তিন ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময় আতঙ্কিত হয়ে রোগী ও তাদের স্বজনরা ছোটাছুটি শুরু করেন। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাহমুদ বলেন, ‘রোগীদের উদ্ধার করে পুরাতন ভবনের নাক-কান-গলা ইউনিটসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। এখন তাদের চিকিৎসাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে।’ তবে মেডিসিন ভবনের কার্যক্রম শুরু করতে তিন দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল।
প্রত্যক্ষদর্শী, ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মেডিসিন ভবনের নিচতলার স্টোররুমে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা। স্টোররুমে থাকা বেডের ফোমে আগুন লেগে যায়, মুহূর্তেই সেখানে আগুন ছড়িয়ে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একে একে ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ধোঁয়ায় পুরো ভবন আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বরিশালের উপপরিচালক মো. মিজানুর রহমান জানান, ঘটনাস্থলে দ্রুত বেশ কয়েকটি ইউনিট পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। তিন ঘণ্টার মধ্যে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা করা হয়। এ সময় ৬০-৭০ জন রোগীকে হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। তিনি নিশ্চিত করেন, এই অগ্নিকান্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে ধোঁয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান কিছুটা বিলম্বিত হয়।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, ভবনের নিচতলার স্টোররুম থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে হাসপাতাল জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সেখানে ভর্তি ৭০ জন ডেঙ্গু রোগীসহ ৫৪৩ জন রোগীর পরিবার, চিকিৎসক ও নার্সরা ছিলেন।
ডা. শ্যামল কৃষ্ণ ম-ল বলেন, ভবনের নিচতলায় অবস্থিত স্টোরে বিভিন্ন আসবাবপত্র, ম্যাট্রেস, মশারি, ও চাদর পুড়ে গেছে। ফলে সেখানকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, ভবনের বাকি চারটি ফ্লোরে শুধু ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে সঠিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে আরও সময় লাগবে।
এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে রোগীদের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। সিনিয়র চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল আশা প্রকাশ করেন, তিন দিনের মধ্যে হাসপাতালের বাকি ফ্লোরগুলো রোগীদের সেবার জন্য চালু করা সম্ভব হবে। নিচতলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে আরও সময় লাগবে।
বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মো. শওকত আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় জানান, অগ্নিকান্ডের কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আগুনের সূত্রপাত হয়তো শর্টসার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত ছাড়া কিছু বলা যাবে না। কমিটিতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক, ভবন নির্মাণকারী সংস্থা গণপূর্তের কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকবেন।
কমিশনার আলী জানান, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা চালাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হবে। তিনি জানান, হাসপাতালের কার্যক্রম ব্যাহত হলে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা এবং আশপাশের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় বিরূপ প্রভাব পড়বে।
তবে এই অগ্নিকা-ের ঘটনা হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ে নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি করেছে। হাসপাতালের প্রশাসন ও চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে, অগ্নিকা-ের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এখন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার করা এবং চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা, যাতে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।