চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা বাড়ানোর ঘোষণা শিগগিরই

শিগগির সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। গত বুধবার এ সংক্রান্ত পর্যালোচনা কমিটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপনের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

সরকারি একাধিক সূত্রমতে, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা সাময়িক সময়ের জন্য ৩২ থেকে ৩৪ বছর হতে পারে। যদিও পর্যালোচনা কমিটি তাদের প্রস্তাবে পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৩৭ বছর করার সুপারিশ করেছে।

প্রস্তাবনায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতি-নাতনিদের জন্য আলাদাভাবে কিছু বলা হয়নি।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। গতকাল সোমবারও দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে শাহবাগে অবস্থান নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

এদিকে অবসরের বয়সসীমা নিয়ে কোনো সুপারিশ করেনি কমিটি। আপাতত চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়লেও অবসরের বয়সসীমা না বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এতে পেনশনের চাপটা বিলম্বিত হবে। অর্থনৈতিকভাবেও দীর্ঘমেয়াদে চাপের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে স্বাভাবিকভাবে পেনশনযোগ্য হতে অন্তত ২৫ বছর চাকরির বয়স হতে হয়। তাই সরকার যদি প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই অবসরের বয়সসীমা বাড়াতে হবে।

বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর। আর অবসরে যাওয়ার বয়স ৫৯ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর। এটি ৩৫ করার দাবিতে কয়েক বছর ধরেই ‘চাকরিতে আবেদনের বয়স ৩৫ প্রত্যাশী শিক্ষার্থী সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসছে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সেই দাবি একাধিকবার নাকচ করে দিলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবির বিষয়টি পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটির প্রধান করা হয়েছিল সাবেক সচিব আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীকে, যিনি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান। কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব। কমিটিতে আরও তিনজন সদস্য ছিলেন।

পর্যালোচনা কমিটির প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, তারা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা পুরুষের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৩৭ বছর করার সুপারিশ করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রস্তাবটি উত্থাপনের পর সরকার আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

তিনি বলেন, ‘কোনো গ্রেডের জন্য আলাদাভাবে বলা হয়নি, সার্বিকভাবে সব সরকারি চাকরির বিষয়ে বলা হয়েছে। অবসরের বিষয়ে কোনো কিছু সিদ্ধান্ত হয়নি। আগের মতোই আছে। এখন যারা চাকরিতে ঢুকবেন তাদের অবসর নিতে অনেক সময় লাগবে। এ বিষয়ে পরে সরকার চিন্তা করবে। যারা এখন চাকরিতে আছেন তারাই আগামী ৭-৮ বছরে অবসরে যাবেন। তারা আগের নিয়মেই অবসরে যাবেন। এখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর কারণে তাদের ওপর তো কোনো প্রভাব পড়ছে না।’

কমিটির আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা ছাত্রদের সঙ্গেও কথা বলেছি। পার্শ্ববর্তী  দেশগুলোর অবস্থাও দেখেছি। বিভিন্ন দেশে যে বয়সসীমা আছে সেটার সঙ্গে আমাদের সুপারিশ সংগতিপূর্ণ হয়েছে। কাজেই বাংলাদেশ পৃথিবী থেকে আলাদা কিছু নয়। আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করিনি।’

‘যাদের বয়সের সুপারিশ আমরা করেছি তারা এখনো চাকরিতে ঢোকেনইনি। তারা চাকরিতে ঢোকার পর চাকরি করলে তখন কী করতে হবে, সেটা সরকার সেই সময় সিদ্ধান্ত নেবে।’ যোগ করেন তিনি।

নারীদের বয়সসীমা ৩৭ বছর সুপারিশ করার বিষয়ে মুয়ীদ বলেন, ‘মেয়েদের একটু আলাদা করে বেশি বয়স দেওয়া হয়েছে। কারণ ছেলেদের মতো মেয়েদের ওই বয়সে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফ্যামিলি ‘অব্লিগেশন্স’ থাকে, বিয়ে হয়ে যায়, বাচ্চা-কাচ্চা হয়। তাই তারা যেন আসতে পারেন। এছাড়া আমাদের নারী কর্মকর্তার সংখ্যা তুলনামূলক কম। কোটা আছে, কিন্তু অতটা ‘ফুলফিল’ হয় না এখনো। সেজন্য আমরা এ সুপারিশ দিয়েছি, যেন নারীরা এ সুবিধাটা পান, তারা আসতে পারেন।’

চাকরিতে অবসরের বয়স বাড়ানো নিয়ে কোনো ক্ষোভ হবে না বলেও জানিয়েছেন কমিটির আহ্বায়ক।

প্রজ্ঞাপন না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা : চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপনের দাবিতে গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আন্দোলনকারীরা এসে তাতে শামিল হন।

তারা বলছেন, ‘দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধির পক্ষে আন্দোলন চলছে। স্বৈরাচারী সরকার আমাদের বিভিন্ন সময় মারধর করেছে। বর্তমান সরকারের সময়েও আমরা ১৪৪ ধারা ভেঙে এ আন্দোলন করেছি। তবে এ সরকার আমাদের দাবি-দাওয়া অনুযায়ী একটি কমিশন গঠন করে ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩৫ ও মেয়েদের  ক্ষেত্রে ৩৭ বছর চেয়ে একটি সুপারিশ করেছে। রাষ্ট্র এটা মেনে নিলে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু যদি এর একদিনও (বয়সসীমা) কম হয়, তাহলে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ তা  মেনে নেবে না।’

পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের পরও কেন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেনÑ সেই প্রশ্নের উত্তরে আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ‘আমরা কোনো আশ্বাসে বিশ্বাসী নই, এর আগেও আমরা বহু আশ্বাস পেয়েছি। কিন্তু আমাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়নি। আমরা চাই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক। ৩২ কিংবা ৩৩ নয়, আমরা চাই ন্যূনতম ৩৫ বছরই যেন রাখা হয় চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে।