‘বিদ্যালয়ের চারদিকে কোমর সমান পানি। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তৃতীয় শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সীমিত আকারে ক্লাস চলছে। শিশু শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোমলমতি শিশুদের ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে শিশুরা বিদ্যালয় আসে, আবার বাড়ি ফিরে বিকাল ৪টায়। এ সময়ের মধ্যে তাদের বাইরে যেতে দেওয়া হয় না। গত দুমাস ধরে এভাবে থমকে আছে বন্যার পানি।’ এসব কথা বলেন কুমিল্লা নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা পূর্ব ইউনিয়নের ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসতেকামত উদ্দিন।
তিনি আরও বলেন, ‘বন্যার সময় শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে অনেক আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে। ওই সময় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়। আমার জীবনে নাঙ্গলকোটে এমন বন্যা কখনো দেখিনি। অনেক বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু পানি কখনো আটকে থাকেনি।’
এ বিষয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া বলল, ‘বিদ্যালয়ের মাঠে হাঁটু সমান পানি। গত দুমাস ধরে আমরা কোনো খেলাধুলা করতে পারছি না। ভয় নিয়ে স্কুলে আসছি।’
সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১৪টি প্লাবিত হয়। অন্যান্য উপজেলায় বন্যার পানি নেমে গেলেও এখনো পানি সরেনি নাঙ্গলকোট, লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ উপজেলায়।
এ বিষয়ে ভবানীপুর গ্রামের অভিভাবক ইয়াকুব আলী রায়হান বলেন, তার সন্তানকে বিদ্যালয় পাঠিয়ে সব সময় উদ্বিগ্ন থাকেন। কারণ বিদ্যালয়ের চারপাশে এখনো পানি। আর শিশুরা পানি দেখলেই সেখানে নামতে চায়।
এবারের বন্যায় নাঙ্গলকোট উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। তারমধ্যে এখনো ৪-৫টি ইউনিয়নের পানি সরেনি। অপরদিকে লাকসাম উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের সবগুলোই প্লাবিত হয়েছে। বর্তমানে তিন থেকে চারটি ইউনিয়নে এখনো পানি সরেনি। পাশাপাশি মনোহরগঞ্জ উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এখনো অর্ধেকেরও বেশি ইউনিয়নে পানি রয়েছে। এতে করে প্রায় দুমাস ধরে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দাবি, ডাকাতিয়া নদী, শাখা নদীর খাল, গ্রামীণ জলাশয়ে থেকে মাটি কেটে নেওয়ার জন্য বাঁধ নির্মাণ করেন স্থানীয় অসাধু মাটি ব্যবসায়ীরা। পরবর্তী সময়ে ওইসব স্থান থেকে বাঁধ কেটে না দেওয়ায় পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়ে পানি আটকে থাকে মাসের পর মাস। সেই সঙ্গে ওই সব নদী-জলাশয়ের মধ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাছ ধরার জন্য বিভিন্ন ধরনের জাল বসিয়ে পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেন। তাছাড়া পানি যাওয়ার ব্যবস্থা না করে নতুন ঘরবাড়ি নির্মাণ ও ছোট ছোট কালভার্টগুলো ভরাট করার কারণেই এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলার লক্ষণপুর ইউনিয়নের গাজিয়াপাড়া গ্রামের আবু ইউসুফ বলেন, ‘গত দুমাস ধরে পানিবন্দি হয়ে আছি। বাড়ির চারদিকে হাঁটু সমান পানি। গৃহপালিত গবাদি পশুগুলো নিয়ে অনেক কষ্টে আছি।’
নাঙ্গলকোট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শরীফ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলার ১৫১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সবগুলোতে বন্যার পানি উঠেছে। এখনো ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পানি সরেনি। যেসব বিদ্যালয়ের পানি সরেছে সেগুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা নিচ্ছি। পাশাপাশি যেসব বিদ্যালয় এখনো পানি সরেনি, সেগুলোতে সীমিত আকারে ক্লাস করানো হচ্ছে।’
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজালা রানী চাকমা বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদী ও শাখা খালগুলো হলো এ উপজেলার পানি নামার একমাত্র পথ। ডাকাতিয়া নদীসহ বিভিন্ন স্থানে কচুরিপানা আটকে পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে তা অপসারণের চেষ্টা করব।’ নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া আক্তার লাকি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ডাকাতিয়া নদী ও শাখা খালগুলো পরিদর্শন করছি, যাতে কোনো বাঁধ বা জাল বসিয়ে পানি চলাচলের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।’
কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম বলেন, ‘যেসব বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করে মন্ত্রণালয় পাঠানো হয়েছে।’
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার বলেন, ‘যেসব এলাকায় এখনো বন্যার পানি সরেনি, সেসব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করব। কী কারণে বন্যার পানি এখনো সরেনি তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’