সেই ফারুকের সইতে চাকরি যাচ্ছে হাথুরুসিংহের

জীবনের দেনা-পাওনার হিসাব কখনো কখনো অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। নিয়তি, প্রকৃতি, ঈশ্বরের ন্যায়বিচার নাকি কর্মফল... যে নামেই ডাকা হোক না কেন, পৃথিবীর হিসাব মিলে যায় পৃথিবীর বুকেই। ঠিক যেমনটা হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটেও। ২০১৬ সালের জুনে, চন্ডিকা হাথুরুসিংহের সঙ্গে বনিবনা না হওয়াতে প্রধান নির্বাচকের পদ ছেড়েছিলেন ফারুক আহমেদ। কোচ হিসেবে দল নির্বাচনে হাথুরুসিংহের উপস্থিতি ও প্রভাব প্রধান নির্বাচক হিসেবে মেনে নিতে পারেননি বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক। এরপর বুড়িগঙ্গায় অনেক জল বয়েছে, পদ্মা নদীর ওপর সেতুও হয়ে গেছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে পালিয়েছেন স্বৈরাচার হয়ে ওঠা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অনুগত ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নাজমুল হাসান পাপনও পলাতক। তাই হাথুরুসিংহের মাথার ওপর আর ছায়া নেই। ২০২৩ বিশ্বকাপে নাসুম আহমেদকে চড় মারার কান্ড এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও ছুটি কাটানোর অভিযোগে অসদাচরণের দায়ে হাথুরুসিংহেকে বরখাস্ত করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে শোকজের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আগামী বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ফিল সিমন্সকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক এই ক্রিকেটার কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের কোচ হিসেবে চাকরি পেতে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন বাংলাদেশে এসে। কিন্তু সেবার ক্রিকেট কর্তারা তাকে না নিয়ে চাকরি দিয়েছিলেন রাসেল ডোমিঙ্গোকে। সেই সিমন্সকেই এখন অনেকটা সেধেই কোচ করতে হচ্ছে বিসিবিকে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে হাথুরুসিংহে এক রহস্য হয়েই থাকলেন। যখন প্রথম দফায় তাকে কোচ করা হয়েছিল, তখন তিনি ক্রিকেট কোচিংয়ের দুনিয়ায় খুব কম লোকের কাছেই পরিচিত। খুব বড় কোনো তারকা ক্রিকেটারও ছিলেন না। তবে তার হাত ধরেই বাংলাদেশ বেশ কিছু বড় সাফল্য পায়, ঘরের মাটিতে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয় ও অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডকে টেস্টে হারানো ছাড়াও বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল ও আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে সেমিফাইনালে খেলেছিল বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় দফাতে মেয়াদ বৃদ্ধির পরই ক্রমশ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে শুরু করেন এই শ্রীলঙ্কান। একে একে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা, মাহমুদউল্লাহসহ জ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারদের সরিয়ে দেওয়ার তৎপরতা শুরু করেন, তেমনি অতিরিক্ত পক্ষপাত প্রদর্শন করেন শুভাগত হোম ও সৌম্য সরকারের দিকেও। ততদিনে হাথুরুসিংহে বুঝে গিয়েছিলেন, পরিচালকদের অনেকেই নামকাওয়াস্তে। তিনি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়াটাই বানিয়ে ফেলেন অভ্যাস অর্থাৎ ক্রিকেট অপারেশনস বিভাগকে ছাপিয়ে সরাসরি বিসিবি প্রধানের সঙ্গেই নিজের যোগাযোগ তৈরি করে হয়ে ওঠেন স্বেচ্ছাচারী। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড থেকে মোটা টাকায় প্রস্তাব পেয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের মাঝপথে হাথুরুসিংহে জানান যে তিনি বিসিবির চাকরি করতে অনিচ্ছুক। সেটাও জানান আইনজীবী মারফত, তার এভাবে চলে যাওয়াটা অনেকেরই পছন্দ হয়নি। অথচ এরপর স্টিভ রোডস, রাসেল ডোমিঙ্গো হয়ে ফের হাথুরুসিংহের কাছেই ফেরত গেছে বিসিবি। তাতে করে হাথুরুসিংহে হয়ে উঠেছেন আরও স্বৈরাচারী, যার প্রমাণ ২০২৩ বিশ্বকাপের ব্যাটিং অর্ডার ওলট-পালট আর দলে বিভেদ লাগিয়ে রাখার মতো কর্মকা-। ফারুক আহমেদ যখন বিসিবির কেউ ছিলেন না, তখন থেকেই হাথুরুসিংহের কড়া সমালোচনা করে আসছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেও তাকে এই নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে। ফারুক সবসময়ই বলে আসছিলেন যে তার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নেই, বরং একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যা করা যায় সেটা করার।

কোচিং জগতে একটা চালু রসিকতা হচ্ছে, কোচ দুই প্রকার- বরখাস্ত হয়েছেন আর বরখাস্ত হতে চলেছেন। হাথুরুসিংহে আপাতত দ্বিতীয়টি। তবে অবাক করার যে বিষয়টা তা হচ্ছে ভারত সফরে বাংলাদেশ দলের ন্যক্কারজনক পারফরম্যান্সের জন্য নয়, হাথুরুসিংহেকে বিদায় নিতে হচ্ছে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ মাথায় নিয়ে। কাল শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনে ফারুক বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ একটা দলের বড় ক্ষতি করে। আপনি যদি পেশাদার হিসেবে কাজ করেন, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দটা চলে যাবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ এখানে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি।’ বাংলাদেশের কোচদের বিদায়ের খবর জানা যায় ই-মেইলে, তবে হাথুরুসিংহেকে এত সহজেই স্বস্তিতে চাকরি ছাড়তে দিচ্ছে না বিসিবি। তাকে কারণ  দর্শাও নোটিস দেওয়া হয়েছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে, ‘দুই তিনটি ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো আসলে একজন সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে আমার জন্য খুব পীড়াদায়ক ছিল। পাশাপাশি এটা দলের জন্যও খুব একটা ভালো উদাহরণ ছিল না। সেগুলো বিবেচনা করে আজ আমরা তাকে একটা কারণ দর্শাও নোটিস এবং দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির চিঠি দিয়েছি।’

হাথুরুসিংহে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড থেকে বরখাস্ত হওয়ার পরও আইনি লড়াই লড়েছিলেন। পরে সেটা আপস রফা হয়েছিল। হাথুরুসিংহে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন যে তিনি প্রথমে চিঠির উত্তর দেবেন। তবে তাতে যে চাকরি বাঁচবে না, সেটাও স্পষ্ট করে বলেই দিয়েছেন ফারুক, ‘হাথুরুর সাসপেনশন হলো...৪৮ ঘণ্টার একটা নোটিস দিয়েছি। মিসকান্ডেক্ট-এর কারণে যখন একটা কোচের বা কারও চাকরি যায়, তখন কিন্তু খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না নোটিস দেওয়ার। তবে যেহেতু তিনি শুধু আমাদের কোচই নন, একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তি এবং এটা দেশের সীমানার বাইরে যাবে, এজন্য আমরা নিজেদের দেশের ও আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করতে চাই। এজন্য ৪৮ ঘণ্টার নোটিস দিয়েছি। ইমিডিয়েট আমরা তাকে সাসপেন্ড করেছি, তারপর টার্মিনেশন হবে।’

প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ফিল সিমন্সকে নতুন কোচের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছে বিসিবি, যার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে গেল হাথুরুসিংহের বিদায়। আর এভাবেই পৃথিবীতেই হিসাবটা মিলিয়ে দিলেন ঈশ্বর।