ধর্মান্তর ও মুসলিম আইনে ফলাফল

ইসলাম ধর্ম প্রত্যেকের জন্য উন্মুক্ত। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল’, এটি মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে, তাকে মুসলমান বা মুসলিম বলা হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনেও এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে যে কোনো ব্যক্তিকে মুসলমান বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি জন্মসূত্রে বা ধর্মান্তরের মাধ্যমে মুসলমান হতে পারেন যদি তিনি মহান আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল, এতটুকু স্বীকার করেন।

এ প্রসঙ্গে অন্যতম মুসলিম আইনবিদ বেইলি বলেছেন, ‘কোনো শিশুর পিতা বা মাতার যে কোনো একজন মুসলমান হলে মুসলিম আইনে ওই শিশুকে মুসলমান বলে ধরে নেওয়া হবে। তবে সাধারণ আচরণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত কথাটি খণ্ডনযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, একজন মুসলমান স্ত্রীলোকের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া হিন্দু পিতার পুত্রসন্তান, হিন্দু হিসেবে লালিত-পালিত হয়ে পরবর্তী সময়ে যদি হিন্দু বিবাহ ব্যবস্থায় কোনো হিন্দু মেয়েকে বিবাহ করে, তবে তাকে হিন্দুই বলতে হবে। যদিও সে মুসলমান মায়ের গর্ভজাত ছিল।’

সর্বোপরি কোনো ব্যক্তি মুসলমান হয়ে জন্মগ্রহণ করার পর ইসলাম ধর্ম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তাকে মুসলমান হিসেবে গণ্য করা হবে। এমনিভাবে কোনো অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার ওপরও মুসলিম আইন প্রযোজ্য হবে।

ধর্মান্তর প্রথা এসেছে যেভাবে : দাওয়াহ বা দাওয়াত আরবি শব্দ। যার অর্থ হলো ইসলামের প্রচার। আক্ষরিক অর্থে এটাকে আমন্ত্রণ বোঝায়। এছাড়া এর অর্থ হলো, বিভিন্নভাবে ডাকা বা আহ্বান করা। আর এই আহ্বানের মাধ্যমেই পৃথিবীতে বিস্তার ঘটেছে ধর্মান্তরের। অর্থাৎ নিজ ধর্ম ত্যাগ এবং ভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করা। পৃথিবীতে ধর্মান্তরের ঘটনা নতুন নয়। যুগে যুগে বিভিন্ন মানুষ তার নিজের ধর্ম পরিত্যাগ করে শান্তির ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর মহান আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে ভালোবেসে ধর্মান্তর হওয়ার কারণে ইসলামের পক্ষ থেকে পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের সুসংবাদ।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনের সঙ্গে ইসলামি নিয়মের অনেক সামঞ্জস্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে বিস্তর অমিল। তেমনই একটি ক্ষেত্র হলো ধর্মান্তরের আইনানুগ ফলাফল। চলুন জানা যাক, মুসলিম আইনে ধর্মান্তরের সেই আইনানুগ ফলাফল।

ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও উত্তরাধিকার : ইসলামি বিধান অনুযায়ী কোনো হিন্দু কোনো মুসলমানের ভূ-সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হতে পারে না। ঠিক একই কথা বলা হয়েছে মুসলিম পারিবারিক আইনে। বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম আইন অনুযায়ী কোনো হিন্দু পুরুষের স্ত্রী-সন্তান থাকা অবস্থায় যদি সে মুসলমান হয়ে অন্য কোনো মুসলমান নারীকে বিবাহ করে, আর যদি সেই স্ত্রীর গর্ভে কোনো সন্তানাদির জন্ম হয় তবে তার মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি তার মুসলমান স্ত্রী-সন্তান উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হবে। হিন্দু স্ত্রী ও সন্তানাদি কোনো সম্পত্তি পাবে না।

বৈবাহিক অধিকার : ইসলাম গ্রহণের পর বাংলাদেশের হিন্দু বিবাহিতা স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে তিনটি মাসিক পূর্ণ হলে আদালতের কোনো ডিক্রি বা আদেশ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে অন্য কোনো মুসলমান পুরুষকে বিবাহ করতে উক্ত স্ত্রীলোকের আর কোনো আইনি বাধা থাকবে না। তবে কোনো খ্রিস্টান স্ত্রী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে মুসলিম আইন অনুযায়ী তার বিবাহবিচ্ছেদ হবে না। অপরদিকে বাংলাদেশের একজন মুসলমান এবং একজন বিদেশি মুসলমানের সঙ্গে বিবাহের আয়োজন হলে সেক্ষেত্রে মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১ প্রয়োগ করা যাবে (অর্থাৎ তাদের বিবাহ নিবন্ধন করা যাবে।)

ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করা : কোনো মুসলিম স্ত্রী ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে পুনরায় স্বধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তখন উক্ত স্ত্রী তার মোহরানার অর্থ দাবি করা থেকে বঞ্চিত হবে। তবে এমন ক্ষেত্রে বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যৌনমিলন হয়ে থাকলে স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের পরও সম্পূর্ণ মোহরানার টাকা দাবি করতে পারবে।