সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যপ্রাপ্ত মানুষ, ইসলামের প্রথম বাহক, ত্যাগ ও কোরবানির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য তারা নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার ও স্বদেশ উৎসর্গ করেছেন। তাদের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মানবজাতির কাছে কোরআন-সুন্নাহ পৌঁছে দিয়েছেন। তাই তাদের মর্যাদা সাধারণ কোনো ব্যক্তির মতো নয়। কোরআন-হাদিসে তাদের প্রশংসা করা হয়েছে এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা, নিন্দা বা তাদের মর্যাদাহানি করার চেষ্টা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী।
কোরআনে সাহাবিদের মর্যাদা : মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তার সঙ্গে যারা আছে তারা কাফেরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর, পরস্পরের প্রতি সদয়। তুমি তাদের রুকুকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সেজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মতো, যে তার কচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কাণ্ডের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষিকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তজর্¦ালা সৃষ্টি করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ইমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।’ (সুরা ফাতহ/২৯) এ আয়াতে মহান আল্লাহ রাসুল (সা.)-এর সাহাবিদের ইমান, ইবাদত, নম্রতা ও মর্যাদার প্রশংসা করেছেন।
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা সর্বপ্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তিনি তাদের জন্য এমন জান্নাত প্রস্তুত করেছেন, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা তওবা/১০০) এ আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট। আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট, তার সমালোচনা বা নিন্দা করার কোনো অধিকার কারও নেই।
হাদিসে সাহাবিদের সমালোচনা নিষিদ্ধ : রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি ওহুদ পর্বতসম স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবুও তা সাহাবিদের এক মুদ (৬০০ গ্রাম) বা অর্ধ মুদ দানের সমান হবে না।’ (সহিহ বুখারি)
এই হাদিসে সাহাবিদের মর্যাদা এত উঁচুতে তুলে ধরা হয়েছে যে, পরবর্তী যুগের সর্বোচ্চ আমলও তাদের সামান্য আমলের সমকক্ষ হতে পারে না। সুতরাং তাদের সমালোচনা করা বা হেয় করা মারাত্মক ধৃষ্টতা।
দ্বীনের প্রচার : সাহাবিদের মাধ্যমেই দ্বীন আমাদের কাছে পৌঁছেছে। কোরআনের প্রতিটি আয়াত, রাসুল (সা.)-এর প্রতিটি হাদিস, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ ইসলামের প্রতিটি বিধান সাহাবায়ে কেরামের মাধ্যমেই আমাদের কাছে এসেছে। যদি তাদের সততা ও বিশ্বস্ততা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়, তাহলে দ্বীনের নির্ভরযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। তাই সাহাবিদের সমালোচনা মূলত ইসলামের ভিত্তিকে দুর্বল করারই একটি অপচেষ্টা।
মুহাদ্দিসরা সর্বসম্মতিক্রমে বলেছেন, ‘আস-সাহাবাতু কুল্লুহুম উদুল’ অর্থাৎ সব সাহাবিই ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত। তাদের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য এবং তাদের সততা নিয়ে সন্দেহ করার সুযোগ নেই।
সাহাবিদের পারস্পরিক মতভেদ : ইসলামের ইতিহাসে কিছু বিষয়ে সাহাবিদের মধ্যে ইজতিহাদি মতভেদ হয়েছিল। কিন্তু তা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার লোভে ছিল না, বরং সত্যের অনুসন্ধানেই ছিল। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকিদা হলো, তাদের সেই মতভেদ নিয়ে কটাক্ষ না করা, কোনো পক্ষকে গালি না দেওয়া এবং সবার জন্য দোয়া করা।
মহান আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ইমানদার ভাইদেরও ক্ষমা করুন, যারা আমাদের আগে ইমান এনেছেন। আর আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ সৃষ্টি করবেন না।’ (সুরা হাশর/১০)
সাহাবিদের সমালোচনার ক্ষতিকর প্রভাব : সাহাবিদের সমালোচনা মানুষের অন্তরে ইসলামের প্রথম যুগ সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করে। এর ফলে কোরআন ও সুন্নাহর ওপর আস্থা দুর্বল হয়। একই সঙ্গে মুসলিম সমাজে বিভেদ, বিদ্বেষ ও চরমপন্থা সৃষ্টি হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যারা সাহাবিদের অবমাননা করেছে, তারা ধীরে ধীরে ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিশ্বাস থেকেও বিচ্যুত হয়েছে। তাই মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ইমানের দৃঢ়তা এবং সুন্নাহর সংরক্ষণের স্বার্থে সাহাবিদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখা অপরিহার্য।
সাহাবিদের প্রতি আমাদের করণীয় : প্রথমত, সাহাবায়ে কেরামের নামের সঙ্গে সম্মানসূচক ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা। দ্বিতীয়ত, তাদের জীবনী অধ্যয়ন করে তাদের ইমান, ইখলাস, ত্যাগ ও তাকওয়া থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তৃতীয়ত, তাদের নিয়ে বিতর্ক, কটূক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক আলোচনা থেকে বিরত থাকা। চতুর্থত, তাদের জন্য দোয়া করা এবং তাদের অনুসরণকে নিজের জীবনের আদর্শ বানানো।
ইসলামের ভিত্তি প্রজন্ম : সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের ভিত্তি প্রজন্ম। তাদের মাধ্যমেই মহান আল্লাহ আমাদের কাছে হেদায়েতের আলো পৌঁছে দিয়েছেন। কোরআন তাদের প্রশংসা করেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের মর্যাদা ঘোষণা করেছেন এবং উম্মতের শ্রেষ্ঠ ইমামরা তাদের সম্মান রক্ষা করার শিক্ষা দিয়েছেন।
অতএব, সাহাবিদের সমালোচনা, নিন্দা বা অবমাননা কোনো মুসলমানের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের কর্তব্য হলো তাদের ভালোবাসা, তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের মর্যাদা অক্ষুণœ রাখা এবং তাদের আদর্শ অনুসরণ করে নিজের জীবনকে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে গড়ে তোলা। মহান আল্লাহ আমাদের অন্তরে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দান করুন এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইমানের ওপর অবিচল থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর