‘তত্ত্বাবধায়ক’ ফেরাতে ১০ যুক্তিতে বিএনপির রিভিউ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় বাতিল চেয়ে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদনে ১০ যুক্তি তুলে ধরেছে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

তিনি বলেন, ৮০৭ পৃষ্ঠার আবেদন প্রস্তুত করে রিভিউ করা হয়েছে। মূল আবেদনটি হচ্ছে ৪১ পৃষ্ঠার, যাতে আপিল বিভাগের ওই রায় বাতিলের পক্ষে ১০ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। আগামী রবিবার আপিল বিভাগে আবেদনটি শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে গত বুধবার আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদনটি করেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘২০১১ সালের ১০ জুন তৎকালীন আপিল বিভাগ ০৪:০৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে। এর ভিত্তিতেই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে, গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতির কাঁধে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসে।’

তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ সরকারের অধীন পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। বিএনপি সরকার জনগণের মতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচন যথাক্রমে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।’

জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ২০১১ সালের ১০ জুন আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে সংক্ষিপ্ত আদেশ দেয়। এ আদেশের ভিত্তিতে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই সংসদ তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধন করে এবং নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত আদেশ পরিবর্তন করা হয়, যা বিচার বিভাগীয় প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।’

রিভিউ আবেদনের উল্লেখযোগ্য যুক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, (ক) আদালতে প্রকাশ্যে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত আদেশ সংবিধান সংশোধনের পর পূর্ণাঙ্গ রায় থেকে বাদ দেওয়া এবং তৎকালীন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের অবসরের ১৮ মাস পর রায় প্রকাশ করে বিচার বিভাগীয় প্রতারণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি ফৌজদারি মামলা চলমান রয়েছে। (খ) গণতন্ত্র এবং অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন যমজ সন্তানের মতো। একটি ছাড়া আরেকটি অর্থহীন। এ রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ ধ্বংস করা হয়েছে। একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (গ) সংবিধান একটি জীবন্ত দলিল। সময়ের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে এর কার্যকারিতা থাকে না। সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব সংবিধানকে প্রাসঙ্গিকভাবে ব্যাখ্যা করা যান্ত্রিকভাবে নয়। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ রায় পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। (ঘ) তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনীও তার ভিত্তিতেই হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট এসবকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট শিশির মনির প্রমুখ।