সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুর এবং স্বল্প আয়ের মানুষ দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যে দিশেহারা। জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। সরকারকে বলব জিনিসপত্রের দাম কমাতে পদক্ষেপ নিন। সিন্ডিকেট ভেঙে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনুন।’ এ জন্য প্রয়োজনে সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের আকার বাড়ানো যেতে পারে বলেও মত দেন তারেক রহমান।
গতকাল শুক্রবার জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) রজতজয়ন্তী (২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী) উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ সময় জেডআরএফ’র ওভারসিজ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ডা. জুবাইদা রহমানও ভার্চুয়ালি সংযুক্ত ছিলেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত, বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগীরা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগীরা ঘরে-বাইরে, প্রশাসনে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তারা সরকারকে ব্যর্থ করে দিতে চায়। ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে না পারলে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের অর্জন বিপন্ন হবে। রাষ্ট্রকে জনগণের প্রত্যাশিত কাজ করতে হবে। স্বৈরাচারের দোসরদের বসিয়ে রেখে কোনো উপকার মিলবে না। মাফিয়াচক্র বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। তবে মানুষ বাকস্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে। মাফিয়াচক্রের কবল থেকে বঞ্চিতরা অধিকার চায়। শহীদদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে। সরকারের কিছু সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।’
রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘সংস্কার অনেক প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি ধারাবাহিক ও চলমান প্রক্রিয়া। কখনো সময়সাপেক্ষ। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। জনগণের সঙ্গে সংস্কার কাজ করলে সেটি সহজ হয়।’
তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন, স্বৈরাচারের আমলে তাদের বিভিন্ন নেতাকর্মী দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি-জায়গা, দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছিল। তারা সেগুলো পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়েছে। সেগুলো পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিও নাগরিকদের দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সবাইকে স্বেচ্ছাসেবীর মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। আসুন প্রতিশোধ-প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রত্যেকে আমরা প্রত্যেকের তরে এই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যাই।’ এ সময় জুলাই-আগস্টে হতাহত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
জেডআরএফ’র কার্যক্রম প্রসঙ্গে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। জেডআরএফ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। দীর্ঘদিন ধরে আপনারা বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করছেন এটি প্রশংসনীয়। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা। জেডআরএফ’র কার্যক্রমকে আমি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। স্বৈরাচারী সরকারের পতন আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সারা দেশে জেডআরএফ’র স্বেচ্ছাসেবীরা অভাবনীয় কাজ করেছে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আজ স্বাধীন দেশে আমরা আছি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব হয়েছে। নতুন প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জুলাই-আগস্টের বিপ্লবে ছাত্রজনতা কিন্তু মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। তারাই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে লড়েছেন। আজ তারাই রাজনীতিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে তাদের দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিচারের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরা দেশকে ভালোবাসি।’
ড. মঈন খান বলেন, ‘বিএনপির হাল ধরেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার আগে জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর বেগম খালেদা জিয়া হাল ধরেছিলেন। তিনি নেতৃত্ব দিয়ে দলকে মানুষের কাছে নিয়ে যান। এই যে ত্যাগের ধারাবাহিকতা সেটি নতুন প্রজন্মকে মনে রাখা উচিত।’
জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে মাত্র ৪ বছরে দেশের যে পরিবর্তন এনেছিলেন পরবর্তী সময়ে ৪০ বছরেও অন্যরা তেমনটি আনতে পারেনি দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আজ পরিবেশের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু জিয়াউর রহমানই তো প্রথম খাল খনন কর্মসূচি করেছিলেন। এটিই তো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি। তিনি নতুন পরিচয় দিয়েছেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। যা একটি ফুলের বাগান। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা রয়েছেন। তিনি মনে করতেন বাংলাদেশের সব ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ। সুতরাং দেশপ্রেমিক সবারই উচিত শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা।’
বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতি করে না উল্লেখ করে ড. মঈন খান আরও বলেন, ‘বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে। জেডআরএফ যার নামে হয়েছে তার কথা বলতে গেলে বলা শেষ হবে না। জেডআরএফ নিরলসভাবে দেশের গরিব-অসহায় মানুষকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই। জেডআরএফ শুধু ২৫ বছর নয়, ২৫০ বছর ধরে জিয়াউর রহমানের কর্মকান্ড তুলে ধরবে।’
রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক এম. শাহীদুজ্জামান, সাবেক রাষ্ট্রদূত এস এম রাশেদ আহমেদসহ নিহত ও আহত পরিবারের কয়েকজন। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম রিজু, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, সাইফুল আলম নীরব, গোলাম সারওয়ার, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ প্রমুখ। অনুষ্ঠানের শুরুতে অধ্যাপক ছবিরুল ইসলাম হাওলাদারের কুরআন তেলাওয়াতের পর অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়ারিস সিমকী।
অনুষ্ঠানে গত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ১০ জন নিহতের পরিবার এবং ১০ জন আহতকে ক্রেস্ট ও অর্থ দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। নিহতদের পরিচয় তুলে ধরেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল, ডা. পারভেজ রেজা কাকন এবং ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম। আহতদের পরিচয় তুলে ধরেন ডা. সাজিদ ইমতিয়াজ উদ্দিন।
এর আগে সকালে রাজধানীর শের-ই বাংলা নগরে নেতাকর্মীদের নিয়ে জিয়াউর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এ সময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি রক্ষায় এই সংগঠনটি গড়ে তুলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংগঠনের প্রেসিডেন্টও তিনি।