মহামারী করোনার আগ পর্যন্ত দেশে যে কয়েকটি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল, তারমধ্যে অন্যতম ছিল উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। ভালো মুনাফার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের আকর্ষণীয় লভ্যাংশও দিয়েছিল। কিন্তু এরপর মাত্র চার বছরেই রুগ্ণ হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন উত্তরা ফাইন্যান্সের মোট আমানতের অর্ধেকেরও বেশি খেলাপি। চার বছর ধরে আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করতে পারছে না। আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটি। অথচ সংকটাপন্ন ও রুগ্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালকদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কিনছে, যা পরিচালকরা পারিবারিকভাবে ব্যবহার করছেন।
সুশাসনের অভাবে রুগ্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির এমন অযাচিত ব্যয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। চার বছরের মধ্যে উত্তরা ফাইন্যান্স কেন একটি রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্ত করা উচিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত উত্তরা ফাইন্যান্সের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। এটি বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৫৫ শতাংশ। গত চার বছর ধরেই ঋণ প্রদানে নানা অনিয়মের কারণে খেলাপি ব্যাপকহারে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক উত্তরার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অপসারণ করার পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে নতুন বোর্ড গঠন করে। তবে দৃশ্যত এর তেমন প্রভাব পড়েনি কোম্পানির পরিস্থিতি উন্নয়নে।
নতুন পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণের পর চাকরিচ্যুত করা হয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অর্ধশত কর্মকর্তাকে। নিয়োগ দেওয়া হয় গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের ঘনিষ্ঠদের। মূলত তারাই উত্তরা ফাইন্যান্সকে রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন।
এদিকে আর্থিক অসংগতি ও চার বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দিলেও উত্তরা ফাইন্যান্স এ বছর প্রচুর টাকা খরচ করেছে ‘অপ্রয়োজনীয়’ খাতে। জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চে উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকায় দুটি হোন্ডা সিআর-ভি ১.৫ টার্বো বা স্পোর্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল (এসইউভি) কেনার অনুমোদন দেয়। এ গাড়ি প্রতিষ্ঠানটির দুজন পরিচালক পারিবারিকভাবে ব্যবহার করছেন। আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানটি শীর্ষ ব্যবস্থাপনা ও বোর্ড থেকে ২৫ কর্মকর্তাকে কক্সবাজারে নিয়ে আসে। গত ৭ থেকে ৯ মার্চ ‘কৌশলগত ব্যবসায়িক বৈঠকের’ জন্য তাদের ব্যয়বহুল হোটেলে রাখতে ১৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা খরচ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির সৌজন্যে কয়েকজন বোর্ড সদস্যের সঙ্গে তাদের সহধর্মিণীরাও ছিলেন। তাদেরও উপহার দেওয়া হয়। যদিও চার বছর ধরে ভবনের ভাড়াও পরিশোধ করতে পারছে না বর্তমান পর্ষদ। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বছরে ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বিপরীতে আদায় খরচের চেয়ে কম। ফলে প্রতিষ্ঠানের মূলধন ঘাটতি হচ্ছে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ বাড়ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহম চৌধুরী বলেন, ‘এই খরচ অগ্রহণযোগ্য। এটি করপোরেট সুশাসনের চরম লঙ্ঘন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা। উত্তরার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা চিহ্নিত করা।’
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, গত তিন বছরেও বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) আয়োজন করতে পারেনি উত্তরা ফাইন্যান্স। এ কারণে এক সময়ের ‘এ’ ক্যাটাগরির উত্তরা ফাইন্যান্স এখন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত দেড় বছরে উত্তরা ফাইন্যান্সের বিতরণকৃত ঋণের কোনো টাকাই ফেরত আসেনি। আর প্রতিষ্ঠানটির এমন বেহাল দশা শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের শুরু থেকেই। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে স্বতন্ত্র পর্ষদ গঠন করা হয়।
আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার দরেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ডিএসইতে ২০২২ সালের আগ পর্যন্ত উত্তরা ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল ৫৫ টাকা, যা গত বৃহস্পতিবার নেমে এসেছে ১৫ টাকা ৭০ পয়সায়। কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০১৯ সালের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ২০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিল। সে বছর কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৯ টাকা ৪৫ পয়সা, যা ২০২০ সালের ৯ মাসে নেমে আসে ১ টাকা ৬৮ পয়সায়।
গত ৯ জুলাই পরিচালকদের আপত্তির মুখে পদত্যাগ করেন উত্তরা ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মিনহাজ আহমদ। ওইদিন ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং সেদিনই তা গ্রহণ করা হয়। তারপরে উত্তরা ফাইন্যান্সের ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ঝুঁকিবিষয়ক কর্মকর্তা (সিআরও) ফারজানা সুলতানা রহমানকে।
আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে অপসারণ করা হয় তার আগের এমডি এস এম শামসুল আরেফিনকেও। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে উত্তরা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যানকে পরামর্শও দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। উত্তরা ফাইন্যান্স থেকে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ আত্মসাতে অন্যদের সহায়তা ও আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য গোপনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।