গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে প্রত্যক্ষভাবে মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, উপত্যকাটি জনশূন্য করতে ওয়াশিংটনের দেওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করছে তেল আবিব। বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলকে যে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, সেগুলো গাজাসহ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কর্তৃত্ববাদ বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে। গতকাল রবিবার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান নিয়েমনাহ বলেন, গাজায় যা হচ্ছে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নীতিগতভাবে একমত। যুক্তরাষ্ট্রের নীরবতার কারণে ইসরায়েল গাজায় এতটা সহিংস হতে পেরেছে। দেশটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের জোগান পেয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে উত্তর গাজায় নতুন করে হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। এমনকি এসব হামলা থেকে বাঁচার জন্য পলায়নরত গাজাবাসীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। সেই সঙ্গে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় নেওয়া শরণার্থী শিবিরগুলোতে নিয়মিত বিমান ও স্থল হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। ফলে ছিটমহলটিতে যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, সেটিতে প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র মদদ দিচ্ছে বলে দাবি করেন হাসান নিয়েমনাহ। তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের বর্বরতার পরও যুক্তরাষ্ট্রের নীরব অবস্থান সে কথাই সমর্থন করে। গাজায় আমরা যে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি দেখছি’, তার দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। তাদের এই সামগ্রিক অভিযানের লক্ষ্যÑ গাজা উপত্যকাকে জনমানবহীন করে ফেলা।’ ইসরায়েল গায়ের জোরে ফিলিস্তিনিদের বিদায় করে তাদের ভূখণ্ড দখলের লক্ষ্যে এগোচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, ইরানে ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গোপন গোয়েন্দা নথি ফাঁস হয়েছে। নথিগুলোতে ‘অতি গোপনীয়’ চিহ্ন দেওয়া আছে। নথিগুলোতে ইরানের ওপর ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির বর্ণনা রয়েছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, হামলা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা মোতায়েন করছে ইসরায়েল। নথিগুলো তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সংস্থা ন্যাশনাল জিওসপ্যাটিয়াল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। নথিগুলো সংগ্রহ করেছিল প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীন আরেক গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি।
নথি ফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে এ ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর তারিখ দেওয়া নথিগুলো ‘মিডল ইস্ট স্পেকটেট’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, পেন্টাগনের এসব নথি কে বা কারা ফাঁস করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা-এফবিআই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। নথিগুলোতে থাকা চিহ্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে এগুলো শুধুই যুক্তরাষ্ট্র এবং এর ঘনিষ্ঠ ‘ফাইভ আইস’ভুক্ত দেশ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য দেখতে পারবে। নথিতে ইরানে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের মহড়া চালানোর কথা বলা হয়েছে। নথি ফাঁসের এ ঘটনা এমন একসময় ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। তবে নথি ফাঁসের ঘটনা সত্য হলে, একে নিরাপত্তার জন্য গুরুতর বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক উপসহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাইক মুলরয়।
অন্যদিকে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বাসভবনে ড্রোন হামলায় তেহরানের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে ইসরায়েলের। এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে তেল আবিব। এই ঘটনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর হামলার আশঙ্কা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন জেনেভা সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসির বৈশ্বিক ঝুঁকি বিভাগের প্রধান জেন-মার্ক রিকলি। তিনি বলেন, এটিকে যদি হত্যাচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।