গণহত্যার প্রতিবাদকারী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধেই মামলা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পক্ষে থাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর খিলগাঁও থানায় এ মামলা হয়। মামলায় আসামি হিসেবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ১৮০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আইনজীবী জেড আই খান পান্না এ মামলার ৯৪ নম্বর আসামি। গত ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আহাদুল ইসলাম নামে একজনকে গুলি ও মারধর করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাটি করেছেন তার বাবা মো. বাকের। তবে আগাম জামিন চেয়ে আবেদন করেছেন আইনজীবী পান্না।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খিলগাঁও থানার ওসি মো. দাউদ হোসেন। এ ধরনের মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে থানাগুলোকে সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তারপরও ঢালাও আসামির নামসহ মামলা নেওয়ার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল এ পুলিশ কর্মকর্তাকে। জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলেই তার নাম কোর্টে দেওয়া হবে। যদি সেখানে কারও নাম না আসে তাহলে চিন্তার কিছু নেই। তাছাড়া কেউ মামলা করতে চাইলে বা কারও নাম দিতে চাইলে সে ক্ষেত্রেও আমরা তাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারি না।’

মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া বাজারের পশ্চিমে শুক্কুর আলী গার্মেন্টস মোড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেন বাদী মো. বাকেরের ছেলে মো. আহাদুল ইসলাম। এ সময় পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন এবং ১৪-দলীয় জোটের নেতকর্মীরা দেশীয় অস্ত্রসহ ককটেল ও সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটান এবং আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য হত্যার উদ্দেশ্যে এ গুলি চালানো হয়। সেখানে আহাদুল ইসলাম বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। সন্ত্রাসীরা তাকে পরে আরও লাঠিপেটা করেন। আহাদুলকে প্রথমে স্থানীয় একটি ক্লিনিক, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।

এ মামলায় আগাম জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছেন জেড আই খান পান্না। আজ সোমবার হাইকোর্টে একটি বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে বলে জানান তিনি। তার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিক্রিয়ায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ মামলা হয়েছে। কিছু বাকস্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে, কিছু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে সবই করা কন্ট্রোলিংয়ের উদ্দেশ্যে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা একটা বাজে মামলা দিল। আর দিলে আসামি হিসেবে এক নম্বর দিত।’

কোটা আন্দোলন ও পরবর্তীকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো বন্ধ চেয়ে একদল আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন। তাদের মধ্যে জেড আই খান পান্নাও ছিলেন। এ রিট আবেদনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের রোষানল ও নানা কটূক্তির মুখে পড়তে হয় তাকে। শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণের সুষ্ঠু তদন্তে ২৯ জুলাই গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের সদস্যও ছিলেন তিনি।

পান্নার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী হত্যাচেষ্টার মামলা দেওয়ায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে এ মামলা ‘অত্যন্ত অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রত্যাশিত ও নিন্দনীয়’।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এক বিবৃতিতে বলেছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একজনকে হত্যা করার অভিযোগে একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং ব্লাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট জেড আই খানকে ১৮০ জনের সঙ্গে আসামি করায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে ব্লাস্ট। এ ছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেড আই খান পান্নার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

সম্প্রতি অন্তর্র্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘রিসেট বাটন’ বিষয়ে বক্তব্যের সমালোচনা করে বক্তব্য দেন জেড আই খান পান্না। সংবিধানে হাত দেওয়ার চেষ্টা, বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আগুন, মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা নিয়ে জোরালো বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত বরখাস্তকৃত লালমনিরহাট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপসী তাবাসসুম ঊর্মিকে আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও জানান।