দোকান দখলকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা চালিয়েছে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় বিপুল পরিমাণ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় তারা। তাদের হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার (২০ অক্টোবর) রাত সাড়ে তিনটায় এ ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে, গতকাল গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল স্টেশন এলাকায় আপ্যায়ন স্টোর নামক দোকানের মালিকানা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। স্থানীয় যুবলীগ নেতা হানিফ তার নেতাকর্মীদের নিয়ে ওই দোকান দখলের চেষ্টা করে। এসময় ওই দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। পরে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকায় মিছিল ও শোডাউন দিতে থাকে। এসময় তারা বিপুল পরিমাণে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেয়। পরে রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকার শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় মসজিদ ও বাসিন্দাদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে স্থানীয় এক মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গুজব ছড়ায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। মাইকে এমন ঘোষনা শুনে রেলক্রসিং এলাকায় জড়ো হতে থাকে স্থানীয় লোকজন। এসময় শিক্ষার্থীদের প্রতিহত করতে ইটপাটকেল ও ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। তবে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোনো ঝামেলা হয়নি। পরে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে পুলিশ পাঠাতে হাটহাজারী থানায় যোগাযোগ করলে মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশের অনুরোধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রেলক্রসিং এলাকা থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে অতর্কিত হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
হামলায় আহতরা হলেন- ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল নোমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী মোনায়েম শরীফ, আরবি বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান। এছাড়া ভাষা ইনস্টিটিউটের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আরাফাত গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবসিক হলগুলো থেকে জিরো পয়েন্টে জড়ো হতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়।
শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় ৪-৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চবি মেডিকেল সেন্টারের চিফ ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এসময় তাদের শরীরে ইটপাটকেল ও পাথরের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া একজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী রেজাউল বলেন, রক্তে রাঙানো এই ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগকে ফিরতে দেওয়া যাবে না। তারা আজ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করার সাহস কীভাবে পায়। আমরা তাদের মতো সন্ত্রাসী বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করবো।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভীর মোহাম্মদ হায়দার আরিফ বলেন, স্থানীয় দুই ব্যাবসায়ীর দ্বন্দ্বে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ককটেল বিস্ফরণ করেন। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে তারা হল থেকে বের হয়ে রেল ক্রসিংয়ের দিকে গেলে তারা আবার ককটেল বিস্ফরণ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের তেমন সহযোগিতা পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন।
জানতে চাইলে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা যে অসহযোগিতার অভিযোগ করছে সেটা সঠিক নয়। আমরা ৬টা ১৮ মিনিটে খবর পেয়েছি এবং ৬টা ২৬ মিনিটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয়দের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছি। যাতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের কোন ঝামেলা না হয়। আর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক করার জন্য সবরকম সহযোগিতা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন শান্ত।
এদিকে গত ৫ আগস্ট রাতে রেলক্রসিং এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় যুবলীগ নেতা হানিফ ও তার অনুসারীরা। ওই সময় দর্শন বিভাগের এক শিক্ষকের গাড়ীতেও হামলা করে তারা। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে রেলওয়ের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে দোকান থেকে চাঁদা তোলে হানিফ। এছাড়া তার ছোটোভাই ছাত্রলীগ নেতা মো. ইকবাল পুরো ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় ডিসের লাইন এবং ওয়াইফাইয়ের ব্যবসা করে। নিম্নমানের ইন্টারনেট দিয়ে দীর্ঘদিন এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য কাউকে তারা এখানে ব্রডব্যান্ডের ব্যবসাও করতে দেয় না। এমনকি শিক্ষার্থীরা তাদের এসব সমস্যা নিয়ে মুখ খুললে গুপ্ত হামলা চালায় হানিফ বাহিনী।