স্বামী মৃত দেখিয়ে ৭ জনের বিধবা ভাতা

যমুনা মন্ডল বিত্তশালীর স্ত্রী, রয়েছে দোতলা বাড়ি। বেঁচে আছেন স্বামী ভোলানাথও। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তিনি পান বিধবা ভাতা। শুধু যমুনা ম-লই নন, স্বামী জীবিত থাকার পরও বিধবা ভাতা পান একটি ওয়ার্ডে সাত নারী। ওয়ার্ডটিতে সুস্থ-সবল মানুষের শারীরিক প্রতিবন্ধী দেখিয়েও কেউ কেউ ভাতার টাকা পান। আবার প্রতিবন্ধী ও বিধবা ভাতার টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। এমন ঘটনা ঘটেছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। এ নিয়ে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে ।

জানা গেছে, খুলনা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে ডুমুরিয়া উপজেলার মাগুরখালী ইউনিয়ন। ৩০টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের দুটি গ্রাম খোরেরাবাদ ও বৈঠাহারা নিয়ে গঠিত ১ নম্বর ওয়ার্ড। এ ওয়ার্ডে বসবাস করেন অন্তত দুই হাজার মানুষ।

উপকারভোগীর তালিকায় নাম থাকা নারী, প্রতিবন্ধী ভাতাভোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ওয়ার্ডে সাতজন নারীর স্বামী জীবিত রয়েছেন। স্বামী জীবিত থাকার পরও তারা বিধবা ভাতা পান। ভাতা পাওয়া ওইসব নারী হলেন  খোরেরাবাদ ও বৈঠাহারা গ্রামের শিল্পী খাতুন, প্রশান্ত বিশ্বাসের স্ত্রী রঞ্জিতা বিশ্বাস, অমল সরকারের স্ত্রী সুশীলা সরকার, পুলিন মন্ডলের স্ত্রী প্রণতা মন্ডল, ভোলানাথের স্ত্রী যমুনা মন্ডল, প্রভাষ মন্ডলের স্ত্রী প্রমিলা রানী মন্ডল, ময়েজ উদ্দীন মোড়লের স্ত্রী সুখজান বিবি। এছাড়া এ দুই গ্রামে প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীর মধ্যে মনুরুল সরদার শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল। কিন্তু তিনি প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এছাড়া অশোক শীল, বিষ্ণুপদ সরদার ও আরতি ম-ল কিছুটা অসুস্থ। তবে ভাতার তালিকায় তাদের নাম থাকলেও টাকা পান না তারা।

খোরেরাবাদ গ্রামের যমুনা মন্ডলের সন্তান পবিত্র মন্ডল জানান, তার বাবা জীবিত আছেন। তালিকায় তার মায়ের নাম রয়েছে। ছোট ভাইয়ের হিসাব নম্বরও দেওয়া আছে। তবে ইউপি সদস্যকে তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে বলেছেন বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে বিষ্ণুপদ সরদার জানান, তার নামে প্রতিবন্ধী ভাতা আছে তিনি জানতেন না। সপ্তাহখানেক ধরে তিনি লোকমুখে শুনছেন। তিনি কোনো টাকাই পাননি।

আরতি মন্ডলের সন্তান উত্তম মন্ডল জানান, তালিকায় নাম ঠিক আছে। কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর তাদের না। দুই বছর আগে তাদের নম্বরে একবার টাকা পেয়েছেন। পরে আর আসেনি।

 খোরেরাবাদের বাসিন্দা প্রণতা মন্ডলের স্বামী পুলিন মন্ডল জানান, তালিকায় নাম তিনি দেখেছেন। তবে তার পরিবারের কেউ এ ভাতার জন্য আবেদন করেননি। অ্যাকাউন্ট নম্বরও তাদের না। কখনো টাকা পাননি।

এ ব্যাপারে মাগুরখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আহমদ আলী দেশ রূপান্তরকে জানান, বিষয়টি নিয়ে গ্রামে হাস্যরস ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তখন তালিকা অনুযায়ী সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। কথা বলে জানতে পারেন খোরেরাবাদ ও বৈঠাহারা গ্রামে সাতজন নারীর স্বামী জীবিত রয়েছেন। দুই থেকে তিন বছর ধরে তাদের স্ত্রীদের নামে বিধবা ভাতার টাকা আসে। এছাড়া একজন সুস্থ-সবল ও তিনজন অসুস্থ মানুষের নামে প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা আসে। তবে এদের মধ্যে সবাই ভাতার টাকা পান না।

তিনি বলেন, ‘মাগুরখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানার ছত্রছায়ার গ্রামের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস আলী সরদার প্রতারণার মাধ্যমে এসব ভাতা অনুমোদন করান। এরসঙ্গে ডুমুরিয়া সমাজসেবা কর্মকর্তা সুব্রত জড়িত। তালিকায় নাম থাকার পরও অনেকে ভাতার টাকা পাননি। যারা পাননি তাদের টাকা কে পান তা তদন্ত করে বের করা দরকার।’

মাগুরখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানা ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউনুস আলী সরদারের বক্তব্য নিতে তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে ইউনুস আলী সরদার ফোন রিসিভ করেননি। আর বিমল কৃষ্ণ সানার দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে।

এ প্রসঙ্গে ডুমুরিয়া সমাজসেবা কর্মকর্তা সুব্রত বলেন, প্রতি মাসে বিধবা ভাতা ৫৫০ টাকা ও প্রতিবন্ধী ভাতা ৮৫০ টাকা দেওয়া হয়। তালিকা দেয় ইউনিয়ন কমিটি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কমিটির সদস্য। তবে এমন অভিযোগ আগে পাওয়া যায়নি। এখন বিষয়টি জানার পর মাগুরখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিমল কৃষ্ণ সানাকে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনিও তদন্ত করে তালিকা থেকে তাদের বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা নেবেন।

খুলনা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কানিজ মোস্তফা বলেন, এখন যাচাই-বাছাই চলছে। অসংগতি থাকলে যাচাই-বাছাইয়ে এসব বাদ যাবে। তবে এ ব্যাপারে অভিযোগ এলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।