বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরছে মিয়ানমার-ভারতীয়রা

বঙ্গোপসাগরসহ উপকূলের নদ-নদীতে মা ইলিশ রক্ষা ও ইলিশের প্রজনন নির্বিঘœ করতে চলছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। গত ১৩ অক্টোবর শুরু হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা চলবে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ মাছ আহরণ, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও মজুদকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশি জেলেরা এই নিষেধাজ্ঞার সরকারি নিয়মকানুন মেনে মাছ ধরা থেকে বিরত রয়েছেন। এই সুযোগে আন্তর্জাতিক জলসীমা অতিক্রম করে ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন বাংলাদেশি জেলেরা। জেলেবিহীন বাংলাদেশের জলসীমানায় এখন ভারতীয় জেলেদের আধিপত্য।

জানা যায়, ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা নিয়ে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ-মীমাংসার পর বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকার মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ উপকূলবর্তী ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চলের ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়। মূলত এখানেই বাংলাদেশের জেলেরা মাছ ধরার সুযোগ পান। বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পিরোজপুরসহ উপকূলীয় জেলে এবং ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছেন ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা।

সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞাকালে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে অবৈধভাবে ইলিশ শিকারের অভিযোগে পটুয়াখালী ও বাগেরহাটে ৭৯ ভারতীয় জেলেকে ৫টি ট্রলারসহ আটক করেছে নৌবাহিনী। চলমান নিষেধাজ্ঞাকালে প্রথম ভারতীয় জেলে আটকের ঘটনা ঘটে গত ১৪ অক্টোবর। ওইদিন বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকারের অপরাধে ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি ফিশিং ট্রলারসহ ৩১ জেলেকে আটক করেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। গত ১৬ অক্টোবর সকালে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরের জেটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বানৌজা শহীদ আখতার উদ্দিন জাহাজের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট মো. মোসিউল ইসলাম। মো. মোসিউল ইসলাম বলেন, আটক ট্রলার দুটি ভারতীয় পতাকাবাহী ফিশিং ট্রলার। ট্রলার দুটিতে ৩১ জন সদস্য ছিলেন। তাদের সবাই ভারতীয় নাগরিক। পরে আটক ট্রলার দুটি পটুয়াখালীতে নিয়ে আসা হয় এবং যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ট্রলার ও আটক ভারতীয় জেলেদের কলাপাড়া থানায় হস্তান্তর করা হয়।

দ্বিতীয় দফায় আটকের ঘটনা ঘটে ১৭ অক্টোবর। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকারের অপরাধে তিনটি ফিশিং ট্রলারসহ ৪৮ ভারতীয় জেলেকে আটক করা হয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর মোংলা বন্দরের অদূরে ফেয়ারওয়ে-সংলগ্ন গভীর সাগর থেকে তিনটি ট্রলার ও জেলেদের আটক করে নৌবাহিনীর টহল দল।

এদিন রাতেই ট্রলারে পাওয়া ২ হাজার ৭০০ কেজি ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিলামে বিক্রি করা হয়।

নৌবাহিনীর বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ভারতীয় জেলেরা বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ জলসীমায় অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকার করছিলেন। টহলরত নৌবাহিনীর সদস্যরা তিনটি ট্রলারসহ ৪৮ ভারতীয় জেলেকে বাংলাদেশ সমুদ্রসীমাতেই আটক করে। এরপর রাতে আটক ট্রলার ও জেলেদের মোংলার নৌবাহিনীর দপ্তরে আনা হয়। ট্রলারে থাকা ২ হাজার ৭০০ কেজি ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রাতেই নিলামে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। পরে শুক্রবার সকালে ট্রলার ও আটক জেলেদের মোংলা থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিষেধাজ্ঞাকালে ভারতীয় জেলেদের অনুপ্রবেশের ফলে দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশের জেলেরা। তাদের দাবি, সঠিকভাবে নিষেধাজ্ঞা পালন করলেও এর সুফল ভোগ করতে পারবেন না তারা। নদ-নদী ও সাগরের সব মাছ ধরে নিয়ে যাবেন ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা। এর ফলে ইলিশ উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি বেকার হয়ে পড়বেন জেলেরা। বিদেশি জেলেদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিসহ ইলিশ রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে যৌথ নিষেধাজ্ঞার দাবি জেলেদের।

বরগুনার পাথরঘাটা বিএফডিসি ঘাটের জেলে শরিফুল, জয়নাল, সেলিম মাঝিসহ একাধিক জেলের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘প্রতিবছর মাছ ধরার চেয়ে বেশি সময় নিষেধাজ্ঞায় পার করি। কখনো ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা, কখনো ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আবার কখনো জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে আমাদের জলসীমানায়। প্রত্যেকটি নিষেধাজ্ঞায় আমরা যথাযথভাবে পালন করে আসছি। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাকালে ভারত ও মিয়ানমারের জলসীমানা উন্মুক্ত থাকায় তারা অনায়াসে আমাদের জলসীমানায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করে নিয়ে যান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় কিছু অসাধু জেলেও গোপনে মাছ শিকার করেন। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে যদি ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে নিষেধাজ্ঞা দিলে, সেটি আরও বেশি কার্যকর হবে। ইলিশ মাছসহ অন্যান্য মাছ বৃদ্ধি পাবে।’

বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহসীন বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ২২ দিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মৎস্য ও প্রাণিস¤পদ অধিদপ্তর। ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ও মা ইলিশ রক্ষায় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে অভিযান অব্যাহত আছে। সেই সঙ্গে পুলিশ, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মাধ্যমে টহল পরিচালনা করা হচ্ছে।

যৌথভাবে নিষেধাজ্ঞা পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, যৌথভাবে ভারত-বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা পালন করতে পারলে আরও বেশি মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি পেত। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে সংশ্লিষ্টরা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

খুলনা নৌ-অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল গোলাম সাদেক বলেন, ভারতীয় জেলেদের প্রতিহত করতে বাংলাদেশের জলসীমায় সোচ্চার রয়েছে নৌবাহিনী। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও কোস্ট গার্ড সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নিষেধাজ্ঞা সফল করা হবে। ইতিমধ্যে কিছু ভারতীয় জেলে আটক হয়েছেন। ভারতীয় জেলে আটকের পরপরই বিমানবাহিনীর সহযোগিতায় আকাশ পথেও টহল অব্যাহত আছে।