ফেসবুকের হিরো থেকে জিরো

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে দেশে যে কজন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দ সায়েদুল হক (ব্যারিস্টার সুমন)। ফেসবুকের কল্যাণে যিনি দেশের মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। নানা ইস্যুতে করা তার ফেসবুক লাইভ সাদরে গ্রহণ করতেন মানুষ। নিজের এলাকায় উন্নয়নমূলক কর্মকা- করে সেগুলো নিজের পেজে শেয়ার করতেন। এভাবেই তিনি নিজ এলাকার পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন। একপর্যায়ে এই ফেসবুকের কল্যাণেই তিনি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। প্রথমবারেই হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিতও হন।

নির্বাচনে জয়লাভ করার পর এমপি হিসেবে পাওয়া সরকারি বরাদ্দের তথ্য ফেসবুকে শেয়ার করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। এর মধ্যেই দেশে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনের শুরুর দিকে ব্যারিস্টার সুমন নিশ্চুপ থাকলেও পরে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন যেহেতু উচ্চ আদালতের মীমাংসার জন্য রয়েছে, তাই আর একটা মাস অপেক্ষা করার জন্য আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ এই ইস্যুতে নিজেদের মুখোমুখি না ভেবে সংযত আচরণ করতে আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর থেকেই আড়ালে চলে যান ব্যারিস্টার সুমন। তাকে ফেসবুকে আর দেখা যায়নি। এদিকে ৫ আগস্টের পর তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। গত সোমবার হঠাৎ তিনি ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলেন। তার কিছুক্ষণ পরই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল তাকে আদালতে তুলে রিমান্ড আবেদন করলে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

গতকাল সুমনকে হত্যাচেষ্টার মামলায় হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। যুবদল নেতা ও মিরপুরের বাঙালিয়ানা ভোজের সহকারী বাবুর্চি হৃদয় মিয়াকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার এ মামলায় তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন মিরপুর মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল হালিম। শুনানি নিয়ে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই হৃদয় জুমার নামাজ আদায় করে মিরপুর-১০ নম্বরে সমাবেশে যান। সেখানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। ককটেল বোমা নিক্ষেপ করেন। গুলিও চালান। এতে গুলিবিদ্ধ হন হৃদয়। তিনি হবিগঞ্জের মাধবপুর ১০ নম্বর হাতিয়াইন ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি। এ ঘটনায় ২৩ সেপ্টেম্বর মিরপুর মডেল থানায় মামলা করেন ভিকটিম নিজেই। এ মামলায় ব্যারিস্টার সুমনকে ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

আদালতে কাঁদলেন ও দুঃখ প্রকাশ করলেন সুমন : গতকাল বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে আদালতে তোলা হয় ব্যারিস্টার সুমনকে। এ সময় কাঁদতে দেখা যায় তাকে। বিএনপি সমর্থক একদল আইনজীবী তখন ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করলে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী তাদের শান্ত করেন।

আদালতে রিমান্ড শুনানি শেষে আইনজীবীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। এ সময় প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীকে উদ্দেশ্য করে ব্যারিস্টার সুমন কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তখন সুমন বলেন, ‘আপনার সঙ্গে আলাদা করে কিছু বলব না স্যার। আপনার মাধ্যমে সব আইনজীবীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি খুব সরি স্যার।’

কোটা আন্দোলন নিয়ে যা বলেছিলেন ব্যারিস্টার সুমন : ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন যেহেতু উচ্চ আদালতের মীমাংসার জন্য রয়েছে, তাই আর একটা মাস অপেক্ষা করার জন্য আন্দোলনকারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ এই ইস্যুতে নিজেদের মুখোমুখি না ভেবে সংযত আচরণ করতে আন্দোলনকারী ও ছাত্রলীগের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।

এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টা চলছে দাবি করে সুমন বলেন, ‘আমি সাবেক একজন ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে বলব, ছাত্রলীগ এ আন্দোলনে আরও সহনশীল ও ধৈর্যের পরিচয় দেবে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো যড়যন্ত্রে যেন পা না দেয়।’

একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আর একটা মাস ধৈর্য ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে সুমন বলেন, ‘তোমরা আর একটা মাস অপেক্ষা করো। হাইকোর্ট ইতিমধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে। বিষয়টি এখন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আর এক মাসের মধ্যে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। এ সময়টুকু তোমরা অপেক্ষা করো। এরপর যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে তোমরা আন্দোলন করো। এখন আন্দোলন করে তোমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করো না।’