১১
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
অবশেষে বাতিল হলো চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল। শুধু ফলই নয়, তার উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষা পাসের সনদ, অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট এবং সনদগুলোর ভেরিফাইড কপি (দেশের বাইরে গেলে শিক্ষা বোর্ড থেকে সনদ ভেরিফাইড করে নিতে হয়, নক্ষত্র দেবনাথের সনদ ভেরিফাইড করেছিল) বাতিল করা হয়।
একই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব দেশে সনদ বাতিলের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের শৃঙ্খলাবিষএক ঝলকসাবেক সচিবের ছেলের এইচএসসির ফল বাতিলয়ক কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ১৯৯৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মেধা কেলেঙ্কারির ঘটনায় বাণিজ্য বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সনদ বাতিল করা হয়েছিল।
নক্ষত্র দেবনাথের সনদ বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক নারায়ণ নাথের ছেলের ফল জালিয়াতির বিষয়টি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে প্রমাণিত। সেই রিপোর্টের আলোকে মন্ত্রণালয় থেকে ফল বাতিলসহ এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। আমরা এরই অংশ হিসেবে বোর্ডের শৃঙ্খলা কমিটির সভায় নক্ষত্র দেবনাথের ফল বাতিলসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিয়েছি।’
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নারায়ণ চন্দ্র নাথ তার ছেলে নক্ষত্র দেবনাথের ফল জালিয়াতি করে জিপিএ ৫ পাইয়ে দিয়েছেন। ওই সময়
পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৬ >
সাবেক সচিবের ছেলের
এইচএসসির ফল বাতিল
নারায়ণ চন্দ্র নাথ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালকের দায়িত্ব আছেন তিনি। তবে ফল জালিয়াতি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর নারায়ণ চন্দ্র নাথকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করা হয়। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে এবং ফল জালিয়াতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে।
বোর্ডের নথি থেকে দেখা যায়, গত ৯ মে নক্ষত্র দেব নাথের সনদ যাচাই করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলাবিষয়ক উপসচিব শাহীনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত আদেশে নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলের ফল জালিয়াতির তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের আদেশ দেওয়ার পর কীভাবে সনদ যাচাই করে নিয়ে যাওয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে বোর্ড চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, ‘পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কীভাবে দিলেন সেই ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত ছিলেন, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে।’
গত বছর ৬ ডিসেম্বর দেশ রূপান্তরে সর্বপ্রথম ‘সচিবের ছেলের পুনঃনিরীক্ষণ আবেদনের রহস্য’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এ ছাড়া গত ১০ মার্চ ‘পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের চিরকুট ফাঁস’ শীর্ষক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়েছিল দেশ রূপান্তরে। সেই রিপোর্টের পর অন্যান্য মিডিয়ায়ও নারায়ণ চন্দ্র নাথের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়ে আসছিল। পরে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও গত ৪ আগস্ট তদন্ত রিপোর্ট জমাদানের পর এ ব্যবস্থা নিয়েছিল মন্ত্রণালয়।
অধ্যাপক নারায়ণ ছেলের ১৩ বিষয়ের মধ্যে ১১ বিষয়ের নৈর্ব্যত্তিক ও সৃজনশীল নম্বরপত্র পরিবর্তন করেছেন জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, ‘নারায়ণ ইস্যুতে যখন বোর্ড অস্থির তখন সরকারের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়ার পর আমি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটিকে সব ধরনের উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করি। একই সঙ্গে বোর্ডের সুনাম রক্ষার্থে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর ফলে তদন্ত কমিটি সত্য বের করে আনতে সক্ষম হয়।’
নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। শুধু বাংলা বিষয় ছাড়া সব বিষয়ে সে জিপিএ ৫ পায়। কিন্তু চতুর্থ বিষয়ে জিপিএ ৫ পাওয়ায় সামগ্রিক ফলাফলে সে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। কিন্তু বাংলায় জিপিএ ৫ না পাওয়ায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে বোর্ডের নিয়মানুযায়ী পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করতে গেলে দেখতে পান কে বা কারা আগে থেকে সব বিষয়ের জন্য পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে রেখেছেন। এতে নিজের সন্তানের জন্য শঙ্কিত হয়ে ছেলের পক্ষে তার মা বনশ্রী নাথ পাঁচলাইশ থানায় গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে জিডি করেন। সেই জিডিতে কে পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করেছেন, তা বের করার আবেদন জানানো হয়। পাঁচলাইশ থানা পুলিশ তদন্ত করে দেখতে পায়, পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনে রেফারেন্স মোবাইল ফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আলীমের মোবাইল নম্বর। এ ঘটনায় আবদুল আলীমকে পুলিশ ডেকেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘কে বা কারা আমার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আবেদন করেছেন, আমি জানি না।’ উপরন্তু তিনি নারায়ণ চন্দ্র নাথকে দায়ী করে পাল্টা জিডি করেছিলেন কোতোয়ালি থানায়। পরে পুলিশ জিডির রিপোর্ট দিলে তার ভিত্তিতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটে অভিযোগ দিয়েছিলেন নক্ষত্রের মা বনশ্রী নাথ। এতে অধ্যাপক আবদুল আলীম ও অধ্যাপক মুহম্মদ ইদ্রিস আলীকে আসামি করা হয়। এর আগে নক্ষত্র দেবনাথের ফল যাতে পুনঃনিরীক্ষণ না হয়, সেজন্য তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুস্তফা কামরুল আখতার বরাবর আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের ওপর ব্যবস্থা নিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে নির্দেশনা দেন। তখন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মুজিবুর রহমান শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদকে চিরকুটের মাধ্যমে এ শিক্ষার্থীর পুনঃনিরীক্ষণ বন্ধের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এতে নক্ষত্র দেব নাথের ফল আর পুনঃনিরীক্ষণ হয়নি।