কোমরে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানো তার নেশা। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি তার পেশা। কথায় কথায় ছোড়েন গুলি। ২০১১ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনবার অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। পরিচয় দেন নগর যুবলীগ নেতা হিসেবে। তবে পুলিশের খাতায় তিনি ‘অস্ত্রধারী ডাকাত’। এই তিনি হলেন মো. ফিরোজ।
গত ১৮ জুলাই নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলিবর্ষণ করে ছাত্র-জনতা হতাহতের ঘটনা ঘটনোর অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
দুর্ধর্ষ এই অস্ত্রধারীকে বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) ফেনী জেলার রামপুরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭। ফিরোজ নগরের চান্দগাঁও থানার মুরাদপুর এলাকার আব্দুল হামিদের ছেলে।
র্যাব-৭ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো. শরীফ-উল-আলম জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ফিরোজ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত দোকান কর্মচারী সায়মান ওরফে মাহিন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে গত ১৮ জুলাই বহদ্দারহাট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও আক্রমণ করে হতাহতের ঘটনা ঘটনোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন ফিরোজ।
র্যাব জানায়, ফিরোজ মূলত পরিচিত ‘ডাকাত ফিরোজ’ নামেই। একসময় ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবেও ছিল তার পরিচিতি। পরবর্তীতে তিনি যুবলীগ নেতা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে পোস্টার-ব্যানার টাঙান। যুবলীগের মিছিল-সমাবেশেও দেখা যেতো সামনের সারিতে।
পেশাদার এই অপরাধী ২০১৫ সালে এসে নিজেকে দাবি করেন নগর যুবলীগ কর্মী হিসেবে। সখ্যতা গড়ে তুলেন নগর অওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আ জ ম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে। এরপর হঠাৎ বনে যান নগর যুবলীগ নেতা।
অভিযোগ আছে, সাবেক নগর ছাত্রলীগ নেতা দিদারুল আলমের হাত ধরেই সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছিরের সাথে ঘনিষ্টতা বেড়ে উঠে ‘ডাকাত’ ফিরোজের। তার (ফিরোজ) বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, নাশকতা, মাদক এবং ছিনতাইসহ পাঁচটি মামলার রয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব-৭।
পুলিশ জানায়, ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই এবং ২০২০ সালের ১ মে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ফিরোজ। ২০১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে নগরের প্রবর্তক মোড়ে একটি রোগ নির্ণয়কেন্দ্র থেকে সন্ত্রাসীরা ১১ লাখ টাকা লুট করে। মারধর করা হয় একজন চিকিৎসককে।
এ ঘটনার পরদিন নগরের বায়েজিদ থানার কয়লাঘর এলাকা থেকে ফিরোজ ও তার সহযোগী মনিরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ফিরোজের পাঁচলাইশের আস্তানা থেকে ১২ রাউন্ড গুলিভর্তি দুটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন, একটি একনলা বন্দুক, একটি বন্দুকের ব্যারেল, তিনটি কার্তুজ, দুটি চাপাতি উদ্ধার করে পুলিশ।
দুর্ধর্ষ এই অস্ত্রধারী ‘ডাকাতের’ বিষয়ে বায়েজিদ বোস্তামি থানার তৎকালীন ওসি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নগর ইউনিটের সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম মহিউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘সন্ত্রাসী ফিরোজের গডফাদার হচ্ছে বিদেশে পলাতক এইট মার্ডার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ হোসেন। বায়েজিদ, পাঁচলাইশ ও নাছিরাবাদ শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজি ও ডাকাতি করতো ফিরোজ।’
২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে নগরের মুরাদপুর এলাকায় টাঙানো একটি বিলবোর্ডে ফিরোজের ছবি ও নামের পাশে ‘যুবলীগ নেতা’ লিখে প্রচারও চালান। ওই বিলবোর্ডে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছিরের ছবিও ব্যবহার করেন। ২০২০ সালের ১ মে ফিরোজকে ইয়াবা ও গুলিসহ আটক করেছিল বায়েজিদ থানা পুলিশ।
২০১৩ সালের ১৯ জুলাই রাতে তিন রাউন্ড গুলিভর্তি নাইন এমএম পিস্তলসহ ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পলাতক থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের কাছ থেকে অপরাধ কর্মকান্ডের ‘দীক্ষা’ নেন ফিরোজ। সাজ্জাদের সহযোগী ছিলেন ইকবাল, একরাম ও মামুন। তাদের সাথে মিলে মুরাদপুর, ষোলশহর ও নাছিরাবাদ এলাকায় অপরাধ সংঘঠন করতেন ফিরোজ।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিদেশে পলাতক থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের এই সহযোগীকে এক সময় নিয়মিতভাবে মেয়র নাছিরের আশেপাশে দেখা যেত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মেয়র নাছিরের সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে একত্রে ছবি ও স্টাটাস দেওয়ার মাধ্যমে ‘ডাকাত’ ফিরোজকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল প্রতিনিয়ত। এছাড়া এক সময় মহানগর যুবলীগের আরেক সদস্য জাবেদুল আলমের সাথেও ফিরোজের ঘনিষ্ঠতা দেখা গেছে।