অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য গোপন এনআরবিসিকে অর্থদন্ড

অনিয়ম জালিয়াতির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত প্রবাসীদের উদ্যোগে গঠিত এনআরবিসি ব্যাংক। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারাও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। একের পর এক অপরাধ করে তা লুকিয়ে রেখেছেন ব্যাংকটির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। অনিয়ম আড়াল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করে আসছিল দুর্নীতিবাজ চক্রটি। তবে এবার সন্দেহজনক লেনদেন ধামাচাপা দিয়ে রাখার মতো অপরাধের জন্য ব্যাংকটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গোপনীয় প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সম্প্রতি এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর প্রেরিত বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপনীয় একটি প্রতিবেদন দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ব্যাংকের ওআর নিজাম রোড শাখার হিসাবধারী মো. রেজাউল বশির চৌধুরীর সঞ্চয়ী হিসাবে দীর্ঘ সময় ধরে সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও তা বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্ট না করে গোপন করা হয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ইউনিটকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই অপরাধের জন্য ব্যাংকটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ সাত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় চলতি হিসাব থেকে জরিমানার অর্থ আদায় করা হবে।

এসব অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের ১৮ মে থেকে ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল সময়ে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়িত্ব পালনকারী শাখা ব্যবস্থাপক, শাখা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা, ব্যাংকের প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা এবং মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সংঘটিত লেনদেনের সঙ্গে জড়িত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়দায়িত্ব নিরূপণ করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শাস্তি নিশ্চিতে ৩০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটির গোপনীয় আরও তথ্য খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উদ্দেশ্যমূলকভাবে উদ্যোক্তা পরিচালক আবু বকর চৌধুরীর জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গোপন করা হয়, যা ব্যাংকের অপরাপর নথি বিশ্লেষণে ধরা পড়ে।  বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করার অপরাধে ব্যাংকের পরিচালক আবু বকর চৌধুরীসহ সব পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এবং কোম্পানি সেক্রেটারিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না সে বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

উদ্যোক্তাদের শেয়ারের তথ্য নিয়েও মিথ্যচার করেছে এনআরবিসি ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘোষণা অনুযায়ী বর্তমানে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ৬৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা/পরিচালক এবং ৩১ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ধারণ করছেন, যা পরিদর্শন দলের কাছে মিথ্যা হিসেবে ধরা পড়েছে। তাই ব্যাংকটির বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না সে বিষয়ে ১৪ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দেওয়ার  নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সঠিক তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংকটির অনিবাসী উদ্যোক্তাদের ধারণকৃত শেয়ারের শতকরা হার অনধিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনায় যথাযথ শর্ত পালনে ব্যর্থ হয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক। অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তার প্রমাণপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটি অনিয়ম করে তা লুকিয়ে রেখেছিল। আমাদের কর্মকর্তারা তা খুঁজে বের করেছেন। অপরাধের জন্য ব্যাংকটিকে জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এসব বিষয়ে জানতে এনআরবিসি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল ইসলামকে গতকাল সন্ধ্যায় যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পারভেজ তমালের নম্বরও বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়েছেন আলোচিত এই চেয়ারম্যান। তার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা রয়েছে। জুলাই বিপ্লব দমনে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে তাকে আসামি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ লেনদেনের ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন আছে তা আরও আধুনিকায়ন করা দরকার। তা আরও সুনির্দিষ্ট হতে হবে। এসব সিস্টেম আরও উন্নত করতে হবে। যেন বিশেষ লেনদেন সহজেই ধরা যায়। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রক্ষকই ভক্ষক। সেজন্য শুধু সাহসি ও যোগ্য লোকবল হলেই হবে না। সততাও লাগবে। পেশাদার হতে হবে।