কমলা-ট্রাম্প প্রায় সমানে সমান তবুও সংশয়

আর মাত্র ১০ দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী প্রচারণা। ভোটের আগে দেশ জুড়ে নিজেদের চূড়ান্ত জনমত জরিপ চালিয়েছে সিএনএন। জরিপে কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমানে সমান লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। তবে জো বাইডেন সরে যাওয়ার পর কমলা হ্যারিসের জনপ্রিয়তার যে জোয়ার এসেছিল সম্প্রতি তাতে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে কমলার সঙ্গে ব্যবধান আশ্চর্যজনকভাবে কমাতে পেরেছেন ট্রাম্প।

সিএনএন বলছে, এ অবস্থায় এসে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা এবং রিপাবলিকানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, হোয়াইট হাউজে প্রবেশে উভয় প্রার্থীরই প্রায় সমান সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের ১০ দিনের জরিপ ট্র্যাকিং গড় বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তবে সাতটি দোদুল্যমান রাজ্যের জরিপ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছে। এর ফলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭০ ইলেকট্রোরাল ভোট কে পাবেন, সে সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না।

জরিপের গড় অনুযায়ী, কমলা হ্যারিস মিশিগানে এক পয়েন্ট এবং পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া, উইসকনসিন ও নেভাদায় ১ শতাংশেরও কম ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে নর্থ ক্যারোলাইনায় দুই পয়েন্টে এবং অ্যারিজোনায় এক পয়েন্টে এগিয়ে আছেন ট্রাম্প।

এই পরিসংখ্যান কমলার জন্য কোনো বিপর্যয় নয় এবং ট্রাম্পের জন্য বিজয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। এ জরিপ ৫ নভেম্বরের ফলাফলের সঙ্গে মিল থাকলে কমলা হ্যারিস ইলেকট্রোরাল কলেজে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাবেন।

কয়েক দিন ধরে ট্রাম্প ফ্যাসিবাদ ও একনায়কতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে বলে আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন কমলা ও তার ডেমোক্রেটিক সমর্থকরা। শুক্রবার অ্যাক্সিওসে মাইক অ্যালেন এবং জিম ভ্যান্ডেহেই লিখেছেন, কয়েকজন শীর্ষ ডেমোক্র্যাট আমাদের ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন, তারা মনে করে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস হেরে যাবেন। যদিও জরিপগুলোর ফলাফল ১১ দিন পর উল্টে যেতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই আঙুল তুলতে শুরু করেছেন কমলার পরাজয়ের জন্য কে বেশি দায়ী।

এদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অশুভ বাগাড়ম্বরে প্রচারণা শিবিরকে অনেকটা ‘আত্মবিশ্বাসী’ বলে মনে হচ্ছে। প্রচারণায় ট্রাম্প তার বিরোধীদের কারাগারে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন। তবে পরস্পরবিরোধী মনোভাব সমর্থনযোগ্য নয় বলে মনে করছেন জরিপকারীদের একাংশ। যদিও নতুন জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প কমলার আগের লিডের ব্যবধান কমিয়ে এনেছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। কমলার প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ট্রাম্প জিতলে তারা ক্ষুব্ধ হবেন। অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রার্থীর সমর্থকদের মাত্র ৪২ শতাংশ বলেছেন, তারা কমলার জয়ের বিষয়ে একই অনুভব করবেন।

এদিকে সিএনএনের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪৭ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার ডেমোক্রেটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলাকে এবং ৪৭ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন। এর আগে সেপ্টেম্বরে হওয়া জরিপে কমলা ৪৮ শতাংশ ও ট্রাম্প ৪৭ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পান।

জো বাইডেন সরে দাঁড়ানোর সময় কমলার প্রতি তার সমর্থন দিয়ে যান। সে সময় সিএনএনের জনমত জরিপে ৪৯ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার ট্রাম্পকে ও ৪৬ শতাংশ ভোটার কমলাকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

এ বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে সিএনএন যে কয়টা জরিপ চালিয়েছে, তার কোনোটিতেই (প্রথমে বাইডেন, তারপর কমলার বিপক্ষে) ট্রাম্প কখনো প্রত্যাশিত ফলাফলের বাইরে যাননি। তিনি আরও দুবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছেন। কোনোবারই জনমত জরিপে তার এবারের মতো অবস্থান ছিল না।

এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির অবস্থা বেশ টালমাটাল। কিন্তু জনমত জরিপগুলোয় উল্লেখ করার মতো স্থিতিশীল অবস্থা দেখা গেছে।

জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটার যারা প্রার্থী পছন্দ করে ফেলেছেন, তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল আছেন। তারা জানেন, তারা কোন দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে চলেছেন। মাত্র ১৫ শতাংশ বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা পছন্দ পরিবর্তন করেছেন।

যারা পছন্দ ঠিক করে ফেলেছেন, তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশ কমলাকে ও ৪৯ শতাংশ ট্রাম্পের পক্ষে বলেছেন। মাত্র ১ শতাংশ অন্য প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন।

এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ সময়ে দেশটির নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সরকার পরিচালনা ও দেশ যেভাবে চলছে, তা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব আরও গভীর হয়েছে। প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোটার বলেছেন, এক বছর আগের চেয়ে তারা অর্থনৈতিকভাবে খারাপ অবস্থায় আছেন। যেখানে মাত্র ১৬ শতাংশ ভোটার বলেছেন, গত ১২ মাসে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

বর্তমান অবস্থা এ বছরের শুরুর দিকের অবস্থা থেকেও খারাপ। এ বছরের শুরুতে ৪১ শতাংশ ভোটার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ার এবং ২২ শতাংশ ভালো হওয়ার কথা বলেছিলেন।

এ ছাড়া নিবন্ধিত ভোটাররা উভয়ের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ট্রাম্পের পক্ষে সমর্থন সেপ্টেম্বরের মতোই আছে প্রায়। কমলার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সামান্য বেড়েছে।

কমলাকে সমর্থন দেওয়া অর্ধেকের বেশি ভোটার বলেছেন, তারা ট্রাম্পের বিরোধিতা (৪৫ শতাংশ) করতে নয় বরং কমলাকে (৫৪ শতাংশ) সমর্থন করে তাকে ভোট দেবেন। তবে গত মাসের তুলনায় ট্রাম্পের বিরোধিতা করতে গিয়ে (কমলার প্রতি) ভোট ৫ পয়েন্ট বেড়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিকে এসে ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছেন কমলা, এটি এর প্রভাবে হতে পারে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সমর্থকরা তার প্রতি জোরালো সমর্থন (৭৩ শতাংশ) জানিয়েছেন। তবে ১৬ শতাংশ বা তার থেকে কিছু বেশি ভোটার বলেছেন, দুই প্রার্থীর কেউই প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, ২৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন দুই প্রার্থীর কেউই সৎ ও বিশ্বস্ত নন। ১৯ শতাংশ বলেছেন, কোনো প্রার্থীই তাদের মতো মানুষদের কথা ভাবেন না।

স্বাধীন ভোটারদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্পের (৪১ শতাংশ) চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছেন কমলা (৪৫ শতাংশ)। উভয় প্রার্থী নিজ নিজ দলের ভোটারদের থেকে শক্ত সমর্থন পেয়েছেন। ৯৩ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার কমলাকে ও ৯২ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন।

নারী ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্পের (৪৪ শতাংশ) থেকে এগিয়ে আছেন কমলা (৫০ শতাংশ)। ৩৫ বছরের কম বয়সী ভোটারদের মধ্যে কমলা ৫১ শতাংশ ও ট্রাম্প ৪১ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।

এ ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ (কমলা ৭৯ শতাংশ, ট্রাম্প ১৩ শতাংশ), হিস্পানিক (কমলা ৫৪ শতাংশ, ট্রাম্প ৩৭ শতাংশ) ভোটারদের মধ্যে কমলা এগিয়ে আছেন।

পুরুষ ভোটারদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ট্রাম্প। ৫১ শতাংশ পুরুষ ভোটার ট্রাম্পকে ও ৪৫ শতাংশ কমলাকে সমর্থন দিয়েছেন।

শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্প (৫৫ শতাংশ, কমলা ৪১ শতাংশ) এগিয়ে। গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ৬৪ শতাংশ ও কমলা ৩১ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ২০২০ সালে যারা ভোট দেননি, এমন ভোটারদের মধ্যে ট্রাম্প ৫০ শতাংশ এবং কমলা ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।