তিন অধিনায়কের কৌশল কতটা কার্যকর

আধুনিক যুগের ক্রিকেটে নেতৃত্বের চাপ কমাতে তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের নীতি অনুসরণ করেছে বিভিন্ন দেশ। যার শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের হাত ধরে ২০১০ সাল থেকে। পল কলিংউডের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল টি-টোয়েন্টির নেতৃত্ব। আর সেবারই প্রথমবার ইংলিশরা জিতে কোনো বিশ্ব আসরের শিরোপা। তারপর থেকেই এই নীতিতে হাটতে শুরু করে অনেক দেশ।

যদিও তার আগে ভারত সাদা ও লাল বলে দুই ভিন্ন অধিনায়ক নিয়ে সফল হয়েছে। তবে ২০১০ পরবর্তী সময়ে তিন অধিনায়কের কৌশল বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ক্রমেই সেটা গ্রহণ করে পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো সেরা দলগুলি। ২০১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশে এসেছিল তিন অধিনায়ক নিয়ে। হাসিম আমলা, এবি ডি ভিলিয়ার্স ও ফাফ ডু প্লেসি। সে বছরই পাকিস্তান এসেছিল শহিদ আফ্রিদি, আজহার আলি ও মিসবাহ উল হককে নিয়ে। তবে দিন যত গড়িয়েছে ততই সব দল বুঝতে পেরেছে, এই কৌশল আদতে অকার্যকর। তিন ফরম্যাটে তিনজন আলাদা অধিনায়কের দিকে না ঝুঁকে দলগুলো সাদা ও লাল বলে আলাদা অধিনায়ক দেয়।

২০০৭ সালে সিনিয়রদের বাদ দিয়ে একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার নিয়ে সাজানো হয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ভারতীয় দল। যেখানে অধিনায়ক করা হয় মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। অভিষেক আসরে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলে ভারত। তারপর থেকে সীমিত সংস্করণে ‘মেন ইন ব্লু’দের নেতৃত্ব দেন তিনিই। তবে টেস্টের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল অনিল কুম্বলের হাতে। তবে এক বছরের মাথায় তিনিও অবসর নিলে সব ফরম্যাটেই অধিনায়ক করা হয় ধোনিকে। তবে ২০১৫ বিশ্বকাপের আগে হুট করে টেস্টের নেতৃত্ব ছেড়ে দিলে বিরাট কোহলি হন সাদা পোশাকের অধিনায়ক। মাঝে সব সংস্করণে রোহিত শর্মা নেতৃত্ব দিলেও এখন আবার টি-টোয়েন্টিতে সূর্যকুমার যাদব।

ইংল্যান্ড তিন অধিনায়ক নীতির প্রবর্তক হলেও তারা একটা সময় সরে আসে। পরবর্তীতে সাদা বল ও লাল বলের আলাদা দুই অধিনায়ক করেছে তারা। দীর্ঘদিন ইয়ন মরগ্যান সাদা বলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ঐ সময়ে টেস্টের অধিনায়কত্ব করেছেন অ্যালিস্টার কুক ও জো রুট। এখন জস বাটলার ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, টেস্টের অধিনায়ক বেন স্টোকস।

অস্ট্রেলিয়া কখনই তিন অধিনায়ক নীতিতে পা বাড়ায়নি। শুরুতে টেস্ট ও ওয়ানডের এক অধিনায়ক রেখে টি-টোয়েন্টির আলাদা অধিনায়ক রেখেছে। মূলত বড় দুই সংস্করণের সহ-অধিনায়কই টি-টোয়েন্টিতে নেতৃত্ব দিতেন। ঐ সময়টাতে আবার সেই অধিনায়ক খেলতেন না সীমিত সংস্করণ। যেমন ২০০৭ সালে রিকি পন্টিং সব সংস্করণে নেতৃত্ব দিলেও পরের আসরে সীমিত ওভারের বিশ্বকাপে অধিনায়ক ছিলেন মাইকেল ক্লার্ক। তারপর ধীরে ধীরে জর্জ বেইলি, শেন ওয়াটসন ও বর্তমানে মিচেল মার্শ। ক্রিকেটের সব সংস্করণের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা তিন ফরম্যাটেই এক অধিনায়ক নীতিতে চলে গিয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা আবারও সিদ্ধান্ত বদলেছে।

বাংলাদেশও ২০১৪ সাল থেকে সাদা ও লাল বলের দুই অধিনায়ক নিয়ে খেলেছিল। টেস্টে মুশফিক এবং ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। তবে ২০১৭ সালে মাশরাফী টি-টোয়েন্টিকে বিদায় জানালে সাকিব আল হাসান পান দায়িত্ব। তখন তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়কের যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। এক সিরিজ পরেই টেস্টেও সাকিবকে দেওয়া হয় নেতৃত্ব। ২০২০ সালে জুয়ারিদের কাছ থেকে পাওয়া প্রস্তাব গোপন রাখার অভিযোগে ১ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারকে। তখন আবার তিন অধিনায়কের যুগে ফিরে যায় লাল সবুজের জার্সিধারীরা। পরে মুমিনুল হককে টেস্টের এবং মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে টি-টোয়েন্টি থেকে সরিয়ে সাকিবকেই অধিনায়ক করা হয়। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে তামিম ইকবাল নেতৃত্ব ছেড়ে দিলে সাকিবই হন তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক। বর্তমানে নাজমুল হোসেন শান্ত সব সংস্করণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশকে।

এবার শান্ত নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথা জানালে নতুন করে আলোচনায় এসেছে তিন অধিনায়কের বিষয়টি। তিন অধিনায়ক নীতির কিছু সুবিধাও আছে। তবে অসুবিধাও একেবারে কম নেই। ক্রিকেটের বিভিন্ন ফরম্যাটে আলাদা কৌশল এবং মানসিকতার প্রয়োজন হয়, ফলে ভিন্ন অধিনায়কত্বের নীতি কখনো কখনো দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে এই নীতি প্রয়োগের কিছু চ্যালেঞ্জও থাকে।

তিন অধিনায়ক নীতির সুবিধা

বিশেষায়িত নেতৃত্ব: প্রতিটি ফরম্যাটের আলাদা চাহিদা থাকে। টেস্ট ফরম্যাটে ধৈর্য, কৌশলগত ধীশক্তি এবং লম্বা সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা দরকার হয়, যেখানে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং আক্রমণাত্মক মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ। আলাদা অধিনায়ক থাকলে প্রতিটি ফরম্যাটের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক নেতৃত্ব পাওয়া যায়।

অধিনায়কের উপর চাপ কমানো: তিন ফরম্যাটের এক অধিনায়ক হলে দায়িত্বের চাপ অনেক বেড়ে যায়, যা একজন খেলোয়াড়ের মানসিক ও শারীরিক ধকল বাড়িয়ে দিতে পারে। ভিন্ন অধিনায়ক থাকলে দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায়, যা তাদের জন্য চাপ কমায়। ফিটনেস ধরে রাখাও সহজ হয়।

দলের সামগ্রিক উন্নতি: তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়ক থাকলে প্রত্যেকে তার নিজ নিজ সংস্করণে দলকে সঠিক কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে তুলতে পারেন। এটি দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সকে এগিয়ে নিতে পারে।

তিন অধিনায়ক নীতির অসুবিধা

বিভক্ত নেতৃত্ব: তিনজন আলাদা অধিনায়ক থাকলে নেতৃত্বে বিভাজন তৈরি হতে পারে। প্রতিটি অধিনায়কের কৌশল, চিন্তাধারা, এবং অধিকার ভিন্ন হতে পারে, যা দলীয় ঐক্য ও সমন্বয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতার অভাব: একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে ধারাবাহিকতা এবং স্থায়িত্ব পেতে একক অধিনায়ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তিন অধিনায়ক হলে প্রতিটি অধিনায়ক আলাদা আলাদা পরিকল্পনা এবং কৌশল তৈরি করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্য সাফল্যের পথের কাঁটা হয়ে উঠতে পারে।

বিভ্রান্তিকর নেতৃত্ব ও ভূমিকা অস্পষ্টতা: ভিন্ন অধিনায়ক থাকলে খেলোয়াড়দের কাছে কখনো কখনো অধিনায়কত্বের ভূমিকায় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। একজন অধিনায়ক হয়তো অন্য ফরম্যাটে খেলোয়াড় হিসেবে থাকবেন, কিন্তু তার নিজস্ব কৌশলগত ধারণা ভিন্ন হতে পারে, যা দলীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়ক নীতি কিছু দলের জন্য কার্যকর হতে পারে, যেমন ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া, যেখানে প্রতিটি ফরম্যাটে নেতৃত্বের জন্য বিশেষজ্ঞ অধিনায়ক পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের জন্য এই নীতি বাস্তবায়ন কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে, কারণ এটি দলীয় সমন্বয় ও স্থিতিশীলতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।