প্লেমেকার কেন 'গেম মেকার' হতে পারেন না!

তাঁকে অনেকে ভালোবেসে বাংলাদেশের ম্যারাডোনা বলে ডাকেন। দেশের ফুটবলের সর্বকালের সেরা প্লে-মেকার মানা হয় তাকে। অথচ সেই রুম্মান বিন ওয়ালী সাব্বিরকে হারতে হয়েছে তাঁর প্রিয় খেলা ফুটবলেরই নির্বাচনে। সাব্বিরের মতো দেশের স্বর্ণসময়ের অনেক তারকাকেই অতীতে বহুবার ভোটের মাঠে হোঁচট খেতে দেখা গেছে। যে তালিকায় আছে শেখ মোহাম্মদ আসলাম, দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল, ইমতিয়াজ সুলতান জনি, হাসানুজ্জামান খান বাবলুদের, শফিকুল ইসলাম মানিকের নাম। শনিবার রাতে সাব্বিরের নামটা নতুন করে উঠেছে সেই ব্যর্থদের তালিকায়। একটা সময় মাঠ মাতানোদের কেন বারবার হারতে হয় ভোটের মাঠে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে বের হয়ে আসবে নির্বাচনের এক কদর্য রূপ। 

এখানে ফুটবলার পরিচয়ের কোন মূল্য নেই। অতীতে আপনি যত বড় তারকাই হন না কেন, ভোটের মাঠে আপনাকে সেই পরিচয় বড় বেশি সহায়তা করবে না। এরচেয়ে বেশি কার্যকর হয় টাকা। আপনি টাকা ছড়ান। সবাই এসে ভোট দিয়ে যাবে। এমনটাই হচ্ছে। এসব দেখে ঘেন্না ঘরে যাচ্ছে

সাব্বির

তার আগে শনিবার সকালের একটা অভিজ্ঞতা বলে নেই। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সুবিশাল লবির এক কোণে মনমড়া হয়ে একাকি বসেছিলেন সাব্বির। কাছে যেতেই হাত বাড়িয়ে দিলেন। কুশল বিনিময়ের সময় বোঝাই গেলো মনটা ভালো নেই। একটু পর নিজেই জানালেন কারণটা। নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হতে তখনও ঢের বাকী। কি অবস্থা জানতে চাইতেই বললেন, 'কি আর অবস্থা হবে বলেন? এখানে ফুটবলার পরিচয়ের কোন মূল্য নেই। অতীতে আপনি যত বড় তারকাই হন না কেন, ভোটের মাঠে আপনাকে সেই পরিচয় বড় বেশি সহায়তা করবে না। এরচেয়ে বেশি কার্যকর হয় টাকা। আপনি টাকা ছড়ান। সবাই এসে ভোট দিয়ে যাবে। এমনটাই হচ্ছে। এসব দেখে ঘেন্না ঘরে যাচ্ছে।' 

সাব্বির পেয়েছেন ৬৬ ভোট। ছয় প্রার্থীর মধ্যে হয়েছেন পঞ্চম। চতুর্থ যিনি হয়েছেন, সেই ফাহাদ করিমের চেয়ে পেয়েছেন ২১ ভোট কম। অথচ সাব্বিরের তারকাখ্যাতীর কাছে এই স্পোর্টস মার্কেটিং কোম্পানির মালিক ধারে-ভারে অনেক পিছিয়ে।  সাব্বিরের ফুটবলে অবদানের দিক থেকেও আলোকবর্ষ দূরে তার অবস্থান। দেশের ফুটবল যে একটা সময় আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তার নেপথ্যে খেলোয়াড় সাব্বিরের অবদান অনস্বীকার্য। মোহামেডানের জার্সিতে যখন খেলতে নামতেন, দর্শক-সমর্থকে গ্যালারি ভেঙে পড়তো কেবল তার খেলার সাক্ষী হতে। 

ফাহাদের মতো বাকি তিনজন যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদেরও ফুটবলে খুব বেশি জানাশোনা নেই। সাবেক খেলোয়াড় কিংবা বড় সংগঠকের তকমাও তাদের নেই। সহসভাপতি পদে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া নাসের শাহরিয়ার জাহেদী প্রথমত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, এরপর একটি ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা। ওয়াহিদ উদ্দীন চৌধুরী হ্যাপির বড় পরিচয় তিনি একজন বড় রাজনীতিবিদের বড় ভাই। সেই পরিচয়ের জোড়ে তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।  আরেকজন নির্বাচিত সহসভাপতি সাব্বির আহমেদ আরেফের প্রথম পরিচয় তিনি রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। এরপরে তিনি ব্রাদার্স ইউনিয়নের কর্মকর্তা। অথচ ভোটের মাঠে জাহেদী, হ্যাপি, আরেফ, ফাহাদরা সাব্বির, শফিকুল ইসলাম মানিকদের চেয়েও 'চৌকষ খেলোয়াড়'। ১২৭ ভোটার সাবেক ফুটবলারদের চেয়ে তাদের ওপর বেশি আস্থা রেখেছেন। তার আছে কয়েকটি কারণ। 

প্রথমত সাব্বির-মানিকরা কেবল তারকাখ্যাতীর জোড়ে নির্বাচনে নেমেছিলেন। এর সঙ্গে জয় নিশ্চিতে আর কোন 'বিশেষ উপাদান' তারা ব্যবহার করেনি। অন্যরা ফুটবলের পরিচয়ের কমতিটা পুষিয়েছেন সেই বিশেষ উপাদানের 'সঠিক ব্যবহার'।  

আরেকটা কারণও বেশ আলোচিত ফুটবলপাড়ায়।  শেষ চার মেয়াদে সাবেক ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন ছিলেন ফুটবলের শীর্ষ কর্তা। তিনি ছাড়াও আরও অনেক সাবেককে দেখা গেছে এই দীর্ঘ সময়ে বাফুফের বিভিন্ন পদে। অথচ ফুটবলের মানটা তাদের আমলেই নামতে নামতে তলানীতে ঠেকেছে। তারা কেবল নিজেদের মসনদের কথা ভেবেছেন। জেলার ফুটবল তাদের অগ্রাধিকারে থাকে নি। থাকে নি ক্লাব ফুটবলের উন্নতির চিন্তাও। তাই সামগ্রিকভাবেই জেলা ও ক্লাবের ভোটারদের কাছে সাবেকদের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে অনেকটাই।  

কারণ আরও একটা আছে। সাবেকদের নিজেদের মধ্যেই আছে হাজারো বিভাজন। এই নির্বাচনেই মিলেছে তার প্রমাণ। প্রায় ত্রিশের বেশি সাবেক ফুটবলার ভোটার হয়েছিলেন এবার। এই সাবেকরা এক থাকলেও সাব্বির-মানিকদের এই হাল হয় না। এক নয় বলেই তাদের সঙ্গী হয় হারের লজ্জা।

মোটা দাগে সাবেকদের না পারার কারণটা বোঝা গেলো। এবার সাব্বিরের হারের আরও দুই-একটি কারণ জেনে নেওয়া যাক। প্রথমত, মোহামেডানের ব্যানার ব্যবহার করে দু'জন সাবেক সহসভাপতি পদে নির্বাচন করেন। সেটা না করে দুজন সমঝোতা করতে পারতেন। একজন সরে গেলে মোহামেডান কেন্দ্রীক ভোটগুলো অন্তত সাব্বির-মানিকে ভাগ হতো না। দ্বিতীয়ত, জানা গেছে, সহসভাপতি প্রার্থী হওয়ার পর তিনি চেষ্টা করেন একজন সিনিয়র সহসভাপতি প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেয়ার। সরাসরি অনুরোধও করেন সেই প্রার্থীকে অন্য একজনকে সুযোগ দিয়ে যেতে।  তবে তার অনুরোধ টিকেনি এবং যাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সেই প্রার্থীও বিষয়টা ভালোভাবে নেননি।  এ নিয়ে সরাসরি সমালোচনাও করেন। ধারণা করা হয়, এখানেও সাব্বির একটা বড় ভুল করেছেন।

সে যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সাব্বিররা হারলে বলতে হেরে যায় ফুটবল। "বিশেষ উপাদান" ব্যবহারেই আসলে ফিঁকে হয় তারকাখ্যাতী।